হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে এমন কোনো দিন যায়নি, যেদিন হাম-সংশ্লিষ্ট কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। এ পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ৯১৮।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) বিশ্লেষণ করা তথ্যের বরাত দিয়ে স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই টিকা নেয়নি।
হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া ১৬ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যসচিব বলেন, টিকা না পাওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে একটি বড় ধরনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে টিকা দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘হামে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। বিভিন্ন সময়ে টিকাদানে তৈরি হওয়া ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, কোনো একটি বছরে ১০ শতাংশ শিশু টিকা থেকে বাদ পড়লে পরের বছরও যদি একই ধরনের ঘাটতি থাকে, তাহলে কয়েক বছরে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা বড় হয়ে যায়।
এ কারণে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়েছে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্যসচিব জানান, আপাতত ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সরকারের হাতে রয়েছে। টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে হামে মৃত্যুর ঘটনা হচ্ছে না এমন তথ্য-উপাত্তও তাদের হাতে রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে ইউনিসেফের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আরও ২৫ লাখ টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে সরকার।
এরই মধ্যে প্রায় ৪১ কোটি টাকার টিকা পাইপলাইনে রয়েছে, যা চলতি মাসের শেষ দিকে দেশে আসতে শুরু করবে। এসব টিকার মধ্যে হামের টিকার পাশাপাশি আরও কয়েক ধরনের টিকা থাকবে।
চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্য করে নেওয়া এ কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ অর্জনের কথা জানিয়েছে সরকার।
তবে গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা তুলনা করলে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভ্যাকসিনোলজিস্ট ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, হামের টিকার কভারেজ ১০০ শতাংশ হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত কভারেজ প্রায় ৮১ শতাংশ। ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় না আনা গেলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব নয়। সংক্রমণ না কমলে মৃত্যুও কমবে না।
তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে। তাই অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১৮। এর মধ্যে সন্দেহভাজন হামে মৃত্যু হয়েছে ৮১৯ জনের এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের।
এ সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এতে দেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০। একই সময়ে পরীক্ষাগারে আরও ৫৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। ফলে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৮৯।