রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ‘লাল বাহিনী’র ত্রাস হিসেবে পরিচিত নূর হোসেন লালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ১০টার দিকে নিকুঞ্জ-২ এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, নূর হোসেন লাল ওই এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং অবৈধ ভূমি দখলের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিলেন।
খিলক্ষেত থানা সূত্রে জানা গেছে, লালের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারসহ নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, খিলক্ষেত থানা থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে নিজের ছোট ভাই বাবুলের মাধ্যমে মাদকের কারবার চালাতেন লাল।
একক নিয়ন্ত্রণে ছিল অপরাধ সাম্রাজ্য
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিকুঞ্জ-২ এলাকার ১ নম্বর রোডের পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত এবং পেট্রোবাংলার উত্তর ও পশ্চিম পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা কয়েকশ দোকানপাট, ফলের দোকান ও পিকআপ স্ট্যান্ড ছিল লালের একক নিয়ন্ত্রণে। তাঁর ক্যাডাররা নিয়মিত এসব দোকান থেকে চাঁদা আদায় করত। অভিযোগ রয়েছে, এই এলাকা থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন তিনি। এলাকায় তাঁর এই অপরাধচক্র ‘লাল বাহিনী’ নামে পরিচিত।
সরকারি প্লট দখল ও ‘টর্চার সেল’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিকুঞ্জ-২-এর ১/এ রোডের অন্তত সাতটি মালিকহীন প্লট (প্লট নম্বর ৫, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৪ এবং ১৫) দীর্ঘদিন ধরে লালের দখলে রয়েছে। সেখানে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে তিনি ভাড়া দিচ্ছেন। দখল করা এসব প্লটে দলীয় সাইনবোর্ড ব্যবহার করায় স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, ১/এ রোডে অবস্থিত বিএনপির একটি রাজনৈতিক কার্যালয়কে তিনি নিজের ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন।
রাজনৈতিক পরিচয় ও দাপট
নূর হোসেন লাল একসময় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই তিনি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হতো অথবা ‘আওয়ামী লীগের লোক’ তকমা দিয়ে পুলিশি হয়রানির হুমকি দেওয়া হতো।
সম্প্রতি নিকুঞ্জে মাদক ও চাঁদাবাজির ভয়াবহতা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে খিলক্ষেত থানার নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন,
“চাঁদাবাজ ও অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। জনগণের জানমাল রক্ষায় পুলিশ যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি এক নির্দেশনায় বলেছেন, যারা বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করছে, তাদের প্রশাসনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। দলীয় পরিচয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
নূর হোসেন লালের গ্রেপ্তারের খবরে নিকুঞ্জ এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে শুধু গ্রেপ্তার নয়, লালের দখলে থাকা কোটি কোটি টাকার সরকারি প্লটগুলো দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।