শহুরে জীবনে সবুজের উপস্থিতি এখন অনেকের কাছেই স্বস্তির নাম। ব্যস্ত কর্মজীবন, ছোট বাসা কিংবা অফিসের সীমিত জায়গার মধ্যেও একটু সবুজ পরিবেশ তৈরি করতে চান অনেকেই। আর এমন মানুষের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্নেক প্লান্ট (Snake Plant)—কম যত্নে বেড়ে ওঠা, দৃষ্টিনন্দন এবং ঘরসজ্জার জন্য উপযোগী একটি ইনডোর উদ্ভিদ।
স্নেক প্লান্টের বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena trifasciata। উদ্ভিদটি আগে Sansevieria trifasciata নামে পরিচিত ছিল। লম্বা, শক্ত ও তলোয়ারের মতো পাতার জন্য এর আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। পাতায় সবুজের ওপর হালকা বা গাঢ় দাগ ও নকশা থাকে, যা বিভিন্ন জাতের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
স্নেক প্লান্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এটি অতিরিক্ত পরিচর্যা দাবি করে না। নিয়মিত পানি দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। বরং টবে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মাটি শুকিয়ে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়া ভালো।
উজ্জ্বল কিন্তু পরোক্ষ আলোতে এটি ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। তবে কম আলোতেও অনেক জাত বেশ কিছুদিন টিকে থাকতে পারে। এ কারণে শোবার ঘর, বসার ঘর, অফিস, বারান্দা কিংবা ঘরের বিভিন্ন কর্নার সাজাতে স্নেক প্লান্ট ব্যবহার করা হয়।
স্নেক প্লান্টকে প্রায়ই ‘এয়ার পিউরিফাইং প্লান্ট’ হিসেবে প্রচার করা হয়। গবেষণাগারে কিছু উদ্ভিদ বাতাসের নির্দিষ্ট দূষক শোষণ করতে পারে—এমন তথ্য রয়েছে। তবে বাস্তব ঘরের স্বাভাবিক বায়ু চলাচলের পরিবেশে একটি বা কয়েকটি টবের গাছ দিয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ঘরের বায়ু পরিশোধন করা যায়—এমন দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ সীমিত।
তাই স্নেক প্লান্টকে ঘরের সৌন্দর্য, সবুজ পরিবেশ ও মানসিক স্বস্তির অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে; তবে এটি এয়ার পিউরিফায়ারের বিকল্প নয়।
স্নেক প্লান্ট সম্পর্কে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা হলো, এটি রাতে অক্সিজেন ছাড়ে। উদ্ভিদটির বিপাকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে রাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের প্রক্রিয়া ঘটতে পারে। তবে একটি ছোট টবের গাছকে ঘরের অক্সিজেনের উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
স্নেক প্লান্ট উপকারী ও আকর্ষণীয় ইনডোর প্লান্ট হলেও এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি না করাই বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক।
যারা প্রথমবার ইনডোর গাছের চাষ শুরু করতে চান, তাদের জন্য স্নেক প্লান্ট বেশ সুবিধাজনক। এর জন্য খুব বড় জায়গার প্রয়োজন হয় না। মাটির সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলেই ভালো ফল পাওয়া যায়।
যা খেয়াল রাখতে হবে—
স্নেক প্লান্টের বংশবিস্তার করা যায় পাতার কাটিং অথবা রাইজোম/অফসেট ভাগ করে। তবে জাতের বৈশিষ্ট্য ঠিক রাখতে চাইলে অফসেট বা রাইজোম ভাগ করে বংশবিস্তার অনেক ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী।
পাতার কাটিং থেকে নতুন গাছ তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হলেও কিছু বৈচিত্র্যময় জাতের ক্ষেত্রে নতুন গাছে মাতৃগাছের একই নকশা নাও থাকতে পারে।
স্নেক প্লান্ট শুধু ঘর সাজানোর গাছ নয়; এটি নার্সারি ব্যবসার জন্যও আকর্ষণীয় একটি পণ্য। ছোট আকারের চারা থেকে শুরু করে বড় শো-প্ল্যান্ট—বিভিন্ন আকারে বাজারজাত করা যায়।
আকর্ষণীয় টব, কভার ও প্যাকেজিং যুক্ত করে এর বাণিজ্যিক মূল্য আরও বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে অফিস, রেস্টুরেন্ট, ফ্ল্যাট, শপিং স্পেস ও আধুনিক ইন্টেরিয়র সাজাতে ইনডোর প্লান্টের চাহিদা বাড়ায় স্নেক প্লান্টের বাজারেও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শহুরে জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। সেই দূরত্ব কিছুটা কমাতে পারে ঘরের একটি ছোট্ট সবুজ গাছ। স্নেক প্লান্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই—কম জায়গা, কম পরিচর্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী সবুজ সৌন্দর্য।
তাই যারা ব্যস্ত জীবনের মাঝেও ঘর কিংবা কর্মস্থলে প্রকৃতির ছোঁয়া রাখতে চান, তাদের জন্য স্নেক প্লান্ট হতে পারে সহজ ও নান্দনিক একটি পছন্দ।
— এ বি খান