ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে থাকা সন্দেহজনক একটি ভূগর্ভস্থ পরমাণু স্থাপনায় চলতি বছর নির্মাণকাজ হঠাৎ বেড়েছে। ছয় বছরের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য জানিয়েছেন একদল গবেষক।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলার সময়েই এই নির্মাণকাজ দ্রুত হয়েছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানা যায়, গ্রানাইট পাথরের গভীরে তৈরি এই স্থাপনাটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নাতাঞ্জ পরমাণু কমপ্লেক্সের কাছে অবস্থিত। রাজধানী তেহরান থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৪০ মাইল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে স্থাপনাটির ওপর নজর রাখছে।
তাদের ধারণা, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ইরানের নতুন ও অঘোষিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষকেরা ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাওয়া উপগ্রহচিত্র পর্যালোচনা করেছেন। সর্বশেষ ছবিটি গত ৯ আগস্টের। এসব ছবি বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, ২০২৬ সালে স্থাপনাটিতে নির্মাণকাজ আগের কয়েক বছরের তুলনায় স্পষ্টভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে স্থাপনার প্রবেশপথ, ভেতরের সড়ক এবং বাইরের নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির কাজ বেশি হয়েছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, গত ছয় বছরের ছবিতে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নির্মাণকাজে তিনটি আলাদা ধাপ দেখা যায়। স্থাপনাটির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এসব অংশের সঙ্গে যুক্ত সড়কগুলোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, শুরুতে সেখানে মূলত পাহাড়ের ভেতর খননকাজ হয়েছে। এরপর কাজ ধীরে ধীরে স্থাপনার ভেতরের নির্মাণের দিকে এগিয়েছে।
একই সঙ্গে স্থাপনার বাইরের অংশ আরো শক্তিশালী করার কাজও চলছে। ২০২৬ সালের ছবিতে সড়ক নির্মাণ ও যানবাহন চলাচলের পরিমাণও আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি দেখা গেছে। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, চলতি বছরে স্থাপনার প্রবেশপথ তৈরি ও শক্তিশালী করা হয়েছে। ভেতরের কিছু সড়ক পাকা করা হয়েছে। প্রবেশপথের আশপাশের অংশ আরো মজবুত করা হয়েছে। এ ছাড়া খননকাজের পর জমে থাকা মাটি ও পাথর সরিয়ে কিছু জায়গা সমতল করা হয়েছে।
এসব পরিবর্তন থেকে গবেষকদের ধারণা, স্থাপনাটি এখন শুধু পাহাড়ের ভেতর খননের পর্যায়ে নেই। বরং সেখানে ভেতরের অবকাঠামো তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। তবে গত শরতে ইরান সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও এর বিভিন্ন অংশ নিয়ে গেছে- ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের এমন দাবির বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি গবেষকেরা। তারা বলেছেন, উপগ্রহচিত্রের তথ্য দিয়ে ওই দাবি খণ্ডন করা সম্ভব হয়নি। আবার দাবিটি সত্য- এমন প্রমাণও তারা পাননি। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে নির্মাণকাজ বাড়ার কারণ কী, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে গবেষকদের একটি ধারণা হলো, ইরান সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত যন্ত্র তৈরির একটি কেন্দ্র বানাতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের উপগ্রহচিত্র দেখে সেখানে কী হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই।
তিনি স্থাপনাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার কর্মকর্তাদের সেখানে গিয়ে পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে ইরান এখন পর্যন্ত তাদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ দেয়নি। ২০২০ সালে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির তৎকালীন প্রধান আলী আকবর সালেহি নাতাঞ্জের কাছে মাটির নিচে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত যন্ত্র তৈরির একটি কেন্দ্র নির্মাণের কথা জানিয়েছিলেন। সিএসআইএসের বিশ্লেষকেরা বলছেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজও শুরু বা বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে। ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন। তাদের ধারণা, এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ওই ইউরেনিয়ামকে আরো বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করার চেষ্টা হতে পারে।
তবে ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকা এবং সেখানে অস্ত্র তৈরির কাজ হচ্ছে- এ দুটি বিষয় এক নয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে আরো বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে হয়। বিশ্লেষকেরা আরো মনে করছেন, ইরান তার পরমাণু কর্মসূচির আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সরিয়ে নিতে পারে। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম ধাতু প্রক্রিয়াজাত করা এবং রাসায়নিকভাবে রূপান্তরের মতো কাজ থাকতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত হামলায় ইসফাহানের কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল। গবেষকদের মতে, এসব স্থাপনায় আগে যে ধরনের কাজ হতো, তার কিছু অংশ ভবিষ্যতে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
ভূগর্ভে থাকার কারণে এই স্থাপনা বাইরে থেকে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে নির্মাণকাজ বাড়ার তথ্য এমন সময় সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থাপনাটিতে হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালাতে পারে। তিনি আরো বলেন, স্থাপনাটিতে কারা যাতায়াত করছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি রয়েছে। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ফারসি ভাষায় কুহ-এ কোলাং গাজ লা বলা হয়। এটি নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। পাহাড়ের শক্ত গ্রানাইটের গভীরে এই স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এর কারণে এটি অনেকটা ভূগর্ভস্থ দুর্গের মতো। সিএসআইএসের বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেও স্থাপনাটি ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে।
এর মধ্যে জিবিইউ-৫৭ নামের বিশাল বাঙ্কার ধ্বংসকারী বোমাও রয়েছে। এই ধরনের বোমা মাটির অনেক গভীরে থাকা স্থাপনায় আঘাত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন সম্পর্কে তেহরানের কাছে তথ্য চেয়েছে। সংস্থাটি স্থাপনাটি সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগও চেয়েছে। তবে ইরান এখন পর্যন্ত আইএইএর কর্মকর্তাদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। ফলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ঠিক কী ধরনের কাজ চলছে, সেখানে পরমাণু কর্মসূচির কোন অংশ রয়েছে এবং স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার কী হবে- এসব প্রশ্নের পুরোপুরি নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। উপগ্রহচিত্রে নির্মাণকাজ বাড়ার বিষয়টি অবশ্য দেখাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটি নিয়ে ইরানের কার্যক্রম চলতি বছর আগের তুলনায় আরো বেশি সক্রিয় হয়েছে।