২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, আলজাজিরা ও নেত্রনিউজের সঙ্গে তথ্য সমন্বয় করতেন আরিফুল ইসলাম আদীব। একটি জাতীয় দৈনিকে তখন সাংবাদিকতা করতেন তিনি। ছিলেন ছাত্র অধিকার পরিষদের সদ্য কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ওই সময় শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছানো মাঠপর্যায়ের গোপন প্রতিবেদনে আদীবকে বিশ্ব গণমাধ্যমে ‘তথ্য সমন্বয়ের মূল ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসন পরিচালনার কেন্দ্র ছিল গণভবন। তাঁর সরকারি এই বাসভবনে বসে জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কোটা আন্দোলন দমনের কৌশল নির্ধারণ করা হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে গণভবন দখল করে বিক্ষুব্ধ জনতা। ওই সময় সেখানকার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা নথিতে আরিফুল ইসলাম আদীব সম্পর্কে এমনটাই উল্লেখ পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি হাসিনার কাছে পাঠানো হতো এসব নথি। বর্তমানে গণভবন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে।
জাদুঘরের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা এক নথির অনুলিপিতে বলা হয়েছে, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. আরিফুল ইসলামের মাধ্যমে বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরা এবং বিতর্কিত সংবাদমাধ্যম নেত্রনিউজে ছাত্র আন্দোলনের তথ্য প্রচার করেন।’ তাঁর নামের পরে বন্ধনীর মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত বিশ্বমিডিয়ার সঙ্গে তথ্য সমন্বয়ের মূল ব্যক্তি হিসেবে আদীবকে চিহ্নিত করা হয়।
জানা যায়, আরিফুল ইসলাম আদীব কোটা আন্দোলনের সময় ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং কাজ করতেন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়। ওই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৮ আগস্ট ঘোষিত লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। তার আগে আন্দোলন চলাকালীন অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতেন।
তিনি জানান, “গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি যেহেতু সাংবাদিকতা পেশায় ছিলাম এবং একই সঙ্গে ছাত্রনেতা ছিলাম। ফলে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে অনলাইনে প্রায় নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তথ্যের আদান-প্রদান হতো। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে ১৮ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় হাসিনা সরকার। এরপর মোবাইলের মাধ্যমে বিশ্বমিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে তথ্য সমন্বয় করতে হয়েছে।”
আরিফুল ইসলাম আদীব আরও বলেন, “বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, আলজাজিরা ও নেত্রনিউজের সাংবাদিকদের আন্দোলনের তথ্য পৌঁছে দিতাম। এ ছাড়াও আরও কিছু মাধ্যমে আমরা নিউজ পাঠাতাম। আকবর ভাই, তানভীর ভাই, এহসান ভাই, হারুন ভাই, শফিক ভাই—এদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। সে কারণেই আমাকে শনাক্ত করে টার্গেট করেছিল শেখ হাসিনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।”
তিনি বলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে সর্বশেষ আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল। ফলে পুলিশ আমার নম্বর পেয়ে যায়। নাহিদকে গুম রাখা হলে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং নুরুল হক নুরও আটক হলে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির হলরুম বুকিং দিয়েছিলাম আমি। পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের পূর্বেই তাঁদের খোঁজ পাওয়া যায়। নাহিদকে তুলে নিলে প্রথমে আমার কথা জিজ্ঞাসা করে।”
আদীব বলেন, “তারা আমার অফিসের সম্পাদকের কাছে আমার ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়। অফিস থেকে চাকরিচ্যুত করার জন্য মালিকপক্ষ ও সম্পাদক শফি ভাইকে চাপ প্রয়োগ করে। এরপর আমাকে তিনবার গুম করার চেষ্টা করা হয়। প্রথমবার ২২ জুলাই মিরপুরে আমার বাসায় ছদ্মবেশে পুলিশ যায়। এরপর ২৪ জুলাই বিবিসির অফিসের নিচ থেকে। সর্বশেষ ২৬ জুলাই ভোর ৪টায় আমার কর্মস্থলে চার গাড়ি যৌথ বাহিনীর অভিযান চালায়। যদিও আমি তখন সেখানে ছিলাম না। রাজনীতি করায় পূর্ব থেকেই পুলিশের হয়রানি সম্পর্কে একটা অভিজ্ঞতা ছিল, যা কাজে লেগেছিল। ২২ জুলাইয়ের পর থেকে আর বাসায় থাকা হয়নি। সরকার শপথ নেওয়ার পর বাসায় ফিরি।