একসঙ্গে মিলে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেক্সিকোর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো নয়। অভিবাসন, বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মতপার্থক্য রয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা আরো বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত বিশ্বের সবচেয়ে উত্তেজনাকর সীমান্তগুলোর একটি। গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে এক মেক্সিকান নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় সম্পর্কের আরো অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই-এর গুলিতে প্রাণ হারান মেক্সিকোর নাগরিক লরেঞ্জো সালগাদো আরাউজো।
আইসিই কর্মকর্তাদের দাবি, সালগাদো আরাউজো বেআইনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। একটি ট্রাফিক সিগনালে তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি গাড়িকে ধাক্কা দেন এবং মৌখিক নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন। যার প্রতিক্রিয়ায় এজেন্টরা তাকে গুলি করে।
তবে তার পরিবার আইসিই-এর এই দাবিকে অস্বীকার করেছে।
তিন সন্তানের পিতা ৫২ বছর বয়সী আরাউজোর পরিবার জানিয়েছে, তার পিছু নেওয়া গাড়িটি যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ছিল, তা জানা থাকলে তিনি অবশ্যই গাড়ি থামাতেন।
তবে লরেঞ্জো সালগাদো আরাউজোই আইসিইর প্রথম শিকার নন। ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইসিইর হাতে এখন পযর্ন্ত ১৭ জন মেক্সিকান প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে আইসিইর আটক কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসায় অবহেলা বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মারা গেছেন ১৪ জন। বাকি ৩ জন আইসিই’র অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় নিহত হন।
তবে আরাউজোর মৃত্যুর ঘটনাটি যেন দীর্ঘদিন ধরে জ্বলতে থাকা সমস্যার আগুনে পেট্রল ঢেলেছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে, অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী অভিযান বা আটক কেন্দ্রগুলোতে ১৭ মেক্সিকান নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি তদন্তের দাবি জানান। মেক্সিকান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই তদন্তের দাবির মূল উদ্দেশ্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকানদের মানবাধিকার রক্ষা করা।
তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের এ ব্যতিক্রমী এ আহবান মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। কেউ কেউ বলছেন, বিষয়টি কূটনৈতিকভাবেই সমাধান করা উচিত ছিল। সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্য দাবি করাটা ঠিক হয়নি। আবার কেউ কেউ বলছেন, আরো আগেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। ১৭ জনের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা ঠিক হয়নি। তবে শিনবাউমের ব্যতিক্রমী সংবাদ সম্মেলন যে মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আরো উত্তাপ আনবে, এ ব্যাপারে সবাই একমত।
শিনবাউমের মন্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অবশ্য আইসিই-এর পক্ষেই সাফাই গেয়েছে। সংস্থাটি সিএনএনকে জানিয়েছে, ‘জনসাধারণ এবং আমাদের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইসিই এজেন্টদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’
সংস্থাটি আরও জানায়, ‘আইসিই হেফাজতে থাকা আটক ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষা পান, তাদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় এবং তাদের পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে।’
ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো-এর উত্তর আমেরিকা গবেষণা কেন্দ্রের শিক্ষাবিদ হোসে লুইস ভালদেস উগালদে শিনবাউমের দাবি প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি কোনো ছোটখাটো ঘটনা নয়। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ঝুলে থাকা বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করবে, যার মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং বাণিজ্য।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফাউস্তো প্রেতেলিন বলেন, সালগাদো আরাউজোর হত্যাকাণ্ডের পর মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ সময়ে এসে পৌঁছেছে। তিনি মনে করেন, এ সংবাদ সম্মেলনে শিনবাউম হয়তো মেক্সিকোতে কিছু রাজনৈতিক সুবিধা পাবেন। তবে এটা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
প্রেতেলিন মনে করেন, সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক পথই অবলম্বন করা উচিত ছিল। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, কূটনৈতিক পথে সমস্যা সমাধানে সুযোগ কম।
মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্তো ভেলাস্কো সাংবাদিকদের বলেন, মেক্সিকো সরকার তাদের নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইতিমধ্যেই ১১টি কূটনৈতিক প্রতিবাদী চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। তাই এখন কূটনীতির বাইরে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হচ্ছে।
প্রেতেলিন এবং ভালদেস শিনবাউমের প্রকাশ্য দাবির সমালোচনা করলেও বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট যথেষ্ট পদক্ষেপ নেননি। নাগরিকদের জীবন রক্ষায় তাকে আরো আগেই আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং কলামিস্ট তোমাস মিল্টন মুনিয়োজ ব্রাভো বলেন, ‘এটি অবিশ্বাস্য যে মেক্সিকান কর্তৃপক্ষকে কেবল কূটনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে বিচারিক ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার মতো একটি কৌশল ঘোষণা করতেই ১৭টি মৃত্যুর অপেক্ষা করতে হলো। তবে আমি এখনো দেখতে চাই যে, যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে সেগুলো বাস্তবে কিভাবে কার্যকর করা হয়।’
মুনিয়োজ ব্রাভো বলেন, নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে তা মেক্সিকোর জন্য একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পের যদি উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকে, তবে সেখানে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে, যা মেক্সিকোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য পক্ষের সাথে আলোচনার সুযোগ করে দেবে। তবে আপাতত সম্পক পুনর্গঠনের কোনো লক্ষণ নেই। দুই পক্ষের অনড় অবস্থান সম্পর্ককে আরো অবনতির দিকে নিয়ে যাবে।