১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন তিনি। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ডাকসুর ভিপি হওয়ার পরই সে সময়ের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে প্রথম কাতারে চলে আসেন তোফায়েল আহমেদ।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন তিনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ দেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৩৩ মাস কারাভোগের পর মুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তোফায়েল আহমেদ। পরে ২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০০৮ সালের পর গঠিত প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি জায়গা পাননি। ২০১৮ সালের পরও মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয় তাকে।
একসময়ের প্রভাবশালী রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের জীবনের শেষভাগে এভাবে দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ার বিষয়ে নানা আলোচনা আছে। ঘনিষ্ঠজনের ভাষ্যে, এই কোণঠাসা দশা হতাশায় ডুবিয়েছিল তোফায়েলকে।
কেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন
শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর পর ১৯৮১ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। দলটির যে নেতারা সে সময় তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনীতিতে তোফায়েলের ব্যাপক প্রভাব ছিল।
তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আশির দশকের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তোফায়েল আহমেদের এক ধরনের শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়।
এর কারণ হিসেবে ওই নেতারা মনে করেন, পঁচাত্তরে শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার পর তোফায়েল আহমেদ যদিও জেল খেটেছেন, কিন্তু সে সময় তিনি শক্ত অবস্থান নেননি বলে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের।
শেখ হাসিনা কয়েকবার বক্তব্যেও তার সেই ধারণা প্রকাশ করেছেন। এটি তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে শেখ হাসিনার শীতল সম্পর্কের একটি বড় কারণ ছিল বলে মনে করেন দলটির নেতাদের অনেকে।
আর দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে শীতল সম্পর্কের কারণে দলীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ই কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয়েছে তোফায়েলকে।
আশির দশকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তোফায়েল। দলটির একজন নেতা জানিয়েছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক হতে না পেরে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল আশির দশকের শেষ দিকে।
আওয়ামী লীগের নীতনির্ধিারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছিল তাকে। সর্বশেষ তিনি দলটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। দলের নীতিনির্ধারণে উপদেষ্টা মণ্ডলীর তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না।
দলীয় রাজনীতিতে হতাশার বিষয়ে তোফায়েল আহমেদ নিজেও ঘনিষ্ঠ রাজনীতিকদের কাছে বিভিন্ন সময় শেয়ার করতেন।
তার সেই ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দলীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় সংকটে পড়ে হতাশ হয়েছেন তিনি। কিন্তু আদর্শ থেকে সরেননি এবং রাজনীতির যাত্রায় থেমে যাননি।
তবে বিতর্কিত এক-এগারোর সরকারের সময় তোফায়েল আহমেদসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ভূমিকার জন্য পরবর্তীতে দলের রাজনীতিতে বেশি বেকায়দায় পড়েছিলেন তারা।
সেই সরকার রাজনীতিতে সংস্কারের কথা বলে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী (প্রয়াত) খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সে সময় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুর রাজ্জাক ও আমির হোসেন আমুর সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ তাদের দল আওয়ামী লীগে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন। বিএনপিরও কয়েকজন নেতা তাদের দলে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন।
আওয়ামী লীগেও সংস্কারপন্থী বলে ওই চার নেতার একটা পক্ষ তৈরি হয়েছিল।
সেই এক এগারোর সরকার তাদের সংস্কার ও দুই নেত্রীর মাইনাস করার ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এক পর্যায়ে দুই নেত্রীর নেতৃত্বেই দল দুটি ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছে এবং বিদায় নিতে হয়েছে সেই সরকারকে।
কিন্তু রাজনীতিতে কপাল পোড়ে সেই সংস্কারপন্থীদের। তোফায়েল আহমেদ দলে চিহ্নিত হন সংস্কারপন্থী হিসেবে এবং একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন দলীয় রাজনীতিতে।
এরপর টানা সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী লীগের শাসনে যদিও তোফায়েল আহমেদ একবার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে গিয়েছিল।
সেই পরিস্থিতি তোফায়েল আহমেদ কতটা সামলে উঠতে পেরেছিলেন, তার রাজনৈতিক সহকর্মীদেরও কারও কারও সেই প্রশ্ন রয়েছে।
তবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতিতে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা