কিছু মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বুক খালি করে না, একটি সমাজের বিবেককেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন, তাঁদের সম্ভাবনা আর আত্মত্যাগ থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীন তেমনই এক নাম—যাঁর জীবন থেমে গিয়েছিল মাত্র ২৪ বছর বয়সে, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশের মতোই বিস্তৃত।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান মেধাবী প্রকৌশলী জাহিদুজ্জামান তানভীন। ১৮ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনটি আজও তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও স্বজনদের কাছে এক গভীর বেদনার স্মৃতি। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার জন্য। কিন্তু আর ঘরে ফিরে আসেননি। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তানভীনের স্বপ্ন ছিল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য নতুন কিছু করার। ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও কাজের অভিজ্ঞতা। বন্ধু ও সহকর্মীদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন মেধাবী, সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনী চিন্তার অধিকারী একজন তরুণ। তাঁর তৈরি ড্রোন একদিন বাংলাদেশের আকাশ পেরিয়ে বিশ্বের আকাশে উড়বে—এমন স্বপ্ন দেখতেন তিনি। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জগতে তাঁর সম্ভাবনা ছিল উজ্জ্বল।
কিন্তু একটি গুলি মুহূর্তেই থামিয়ে দেয় সেই স্বপ্নযাত্রা।
তানভীন ছিলেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT)-এর মেধাবী প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি ড্রোনভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু একজন প্রকৌশলী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, উদ্ভাবক ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন তরুণ। তাঁর চলে যাওয়া প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একটি অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়।
তবে তানভীনের গল্পের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়টি তাঁর মায়ের কণ্ঠে।
তানভীনের মা বিলকিস জামান স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, প্রতিদিন ছেলে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি তাকে সালাম দিতেন, দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিতেন এবং দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। কিন্তু ১৮ জুলাইয়ের সেই দিনটি ছিল ব্যতিক্রম। সেদিন তানভীন যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যান, মা ব্যস্ততার কারণে তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারেননি। ছেলের সঙ্গে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর শেষ দেখা, শেষ কথা। মায়ের মনে আজও সেই আক্ষেপ—আরেকবার যদি ছেলেকে বিদায় জানাতে পারতেন!
একজন মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু যে কতটা অসহনীয়, তানভীনের মায়ের কান্না তারই নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন, যে সন্তান একদিন দেশের প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেবে—সেই
সন্তানই একদিন রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে ফিরলেন। একটি পরিবার হারাল তাদের প্রিয় সন্তানকে, আর বাংলাদেশ হারাল সম্ভাবনাময় এক তরুণ উদ্ভাবককে।
উত্তরার আজমপুর এখন শুধু একটি ব্যস্ত নগর এলাকা নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে এটি রক্ত ও আত্মত্যাগের এক স্মৃতিবহ স্থান। তানভীনের মতো বহু মানুষ সেখানে জীবন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের স্মৃতি আজও ছড়িয়ে আছে উত্তরার অলিগলি, সড়ক ও মানুষের হৃদয়ে।
তানভীনের সহকর্মীরা তাঁর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তি বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর নামে সৃজনশীল কর্মপরিসর গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে নতুন প্রজন্মের তরুণরা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যেতে পারে। এ যেন একজন শহীদের অপূর্ণ স্বপ্নকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার প্রত্যয়।
শহীদ তানভীনের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি তরুণ প্রাণের মূল্য শুধু তার পরিবারের কাছে নয়, পুরো জাতির কাছে অপরিসীম। তাঁর মৃত্যু একটি পরিবারের শোক, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন একটি জাতির সম্পদ।
আজ যখন উত্তরার আজমপুরের ব্যস্ত সড়কে মানুষ চলাচল করে, তখন হয়তো অনেকেই জানেন না—এই পথেই একদিন থেমে গিয়েছিল এক তরুণ প্রকৌশলীর জীবন। থেমে গিয়েছিল একটি মায়ের স্বপ্ন। থেমে গিয়েছিল আকাশে ড্রোন ওড়ানোর এক তরুণ উদ্ভাবকের পথচলা।
কিন্তু তানভীনের স্বপ্ন থেমে থাকার কথা নয়।
যে আকাশে তিনি তাঁর স্বপ্নের ড্রোন ওড়াতে চেয়েছিলেন, সেই আকাশেই একদিন তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই হোক তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।
শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীন—তুমি নেই, কিন্তু তোমার স্বপ্ন আছে। তোমার স্মৃতি আছে। আর আছে এক নতুন বাংলাদেশের আকাশে উড়ে চলার অনন্ত প্রত্যাশা।