একটি জাতির মেরুদণ্ড বলা হয় শিক্ষাকে, আর সেই মেরুদণ্ডের কারিগর হলেন শিক্ষক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সাথে একজন শিক্ষার্থীর আচরণ এবং পরবর্তীতে সেই শিক্ষার্থীর অভিভাবক—যিনি রাষ্ট্রের উচ্চ আদালতের একজন সম্মানিত বিচারপতি—কর্তৃক শিক্ষককে হেনস্তা করার যে ঘটনাটি সামনে এসেছে, তা আমাদের সমাজব্যবস্থার এক ভয়াবহ ক্ষতের জানান দিচ্ছে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির অপমান নয়, বরং পুরো শিক্ষক সমাজের গালে এক চরম চপেটাঘাত।
ইতিহাসের আয়নায় শিক্ষকের মর্যাদা:
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সভ্যতার ক্রমবিকাশে শিক্ষকদের স্থান ছিল সবার উপরে। দিল্লির সম্রাট আলমগীরের সেই বিখ্যাত কাহিনীটি আজও আমাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়। একদিন সম্রাট দেখলেন, তার পুত্র তার শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছেন আর শিক্ষক নিজের পা নিজে ধুয়ে নিচ্ছেন। সম্রাট আলমগীর এতে অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি শিক্ষককে ডেকে পাঠালেন। শিক্ষক ভয় পেয়েছিলেন যে, হয়তো শাহজাদাকে দিয়ে পানি ঢালানোর অপরাধে তার শাস্তি হবে। কিন্তু সম্রাট বললেন, “আমি আমার পুত্রকে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম আদব শেখার জন্য। কিন্তু আপনি তাকে দিয়ে কেবল পানিই ঢালালেন? সে কেন নিজ হাতে আপনার পা ধুয়ে দিল না?”
এই ছিল তৎকালীন শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি। তারা জানতেন, যে জাতি শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না, সেই জাতি কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বলেছিলেন, “আমি আমার পিতার কাছে ঋণী আমার জীবনের জন্য, কিন্তু আমার শিক্ষকের কাছে ঋণী আমার জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করার জন্য।”
উন্নত বিশ্বে শিক্ষকের অবস্থান:
আজ আমরা যেসব দেশকে উন্নত বা সভ্য বলে অভিহিত করি, তাদের উন্নতির মূলে রয়েছে শিক্ষকদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। জাপানে শিক্ষকদের মর্যাদা এতটাই বেশি যে, সেখানে শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ প্রোটোকল প্রয়োজন হয় না; বরং সাধারণ নাগরিকরাই তাদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেন। জার্মানিতে বিচারপতি, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে শিক্ষকদের বেতন এবং সামাজিক মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এমনকি যখন অন্য পেশাজীবীরা তাদের বেতন বাড়ানোর দাবি তুলেছিলেন, তখন দেশটির তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল বলেছিলেন, “আমি তোমাদের বেতন তাদের সমান কীভাবে করি, যারা তোমাদের তৈরি করেছেন?”
উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের ঘটনা: এক নৈতিক বিপর্যয়:
গত ১৬ এপ্রিল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে যা ঘটেছে, তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান ক্লাসে সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল পাঠদান করছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষার্থী অযাচিতভাবে বারবার অন্য বিষয়ে প্রশ্ন করে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। শিক্ষক যখন তাকে বুঝিয়ে বলতে গেলেন, তখন সেই শিক্ষার্থী শিক্ষকের স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করার মতো ধৃষ্টতা দেখায়। একজন কিশোর শিক্ষার্থীর অবচেতনে কতটা বিকৃতি থাকলে সে তার গুরুর প্রতি এমন আচরণ করতে পারে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিক্ষক হয়তো তাকে শাসন করেছেন, যা যেকোনো স্বাভাবিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি সাধারণ শাসন প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা বাড়ে এরপর। সেই শিক্ষার্থীর পিতা, যিনি একজন বিচারপতি, তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে শিক্ষককে তার বাসায় ডেকে পাঠান। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে সেই শিক্ষককে চরমভাবে অপমান ও হেনস্তা করা হয়। বিচারপতির সহধর্মিণী যে আচরণ করেছেন, তাকে শিক্ষার্থীরা ‘অমার্জনীয়’ ও ‘ধৃষ্টপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
বিচারের বাণী যখন নিভৃতে কাঁদে:
একজন বিচারপতির কাজ হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তিনি সমাজের আইকন, আইনের রক্ষক। কিন্তু যখন খোদ বিচারপতির ঘর থেকেই অন্যায়ের প্রশ্রয় আসে, তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? শিক্ষককে বাসায় ডেকে নিয়ে অপমান করা কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, এটি একটি মানসিক দৈন্যদশা।
একজন বিচারপতি হিসেবে তার উচিত ছিল সন্তানের ভুল সংশোধন করা। বাদশা আলমগীর যা করেছিলেন, তার উল্টো পথে হেঁটে তিনি কি সমাজকে এই বার্তা দিলেন যে—ক্ষমতা থাকলে শিক্ষকের স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত কিংবা কলার ধরা যায়? এই ঘটনাটি আমাদের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতাকে প্রকট করে তোলে। যখন একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে একজন কিশোরের হাতে লাঞ্ছিত হন এবং পরে সেই কিশোরের অভিভাবকের হাতে পুনরায় হেনস্তা হন, তখন সেই শিক্ষক কোন মনোবল নিয়ে আগামী প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাবেন?
সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে?:
এই ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখছি দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছে, তাদের গলায় জুতার মালা পরানো হচ্ছে, এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। আমি নিজেও এই পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছি। দুর্ব্যবহারের মানসিক যন্ত্রণার ভার কত কঠিন তার ভুক্তভোগী আমি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শিক্ষার্থীদের বেয়াদবি এবং অনৈতিক কাজ করার নেপথ্যে কাজ করছে অপশক্তি সমাজবিরুদ্ধ শক্তি। কাজ করছে এক ধরনের ‘পাওয়ার কালচার’ বা ক্ষমতার দাপট। যখন রাজনীতি বা প্রশাসনের ক্ষমতা শিক্ষার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজ পচতে শুরু করে।
শিক্ষার্থীরা যখন দেখে তাদের সহপাঠী একজন শিক্ষককে অপমান করে পার পেয়ে যাচ্ছে এবং তার প্রভাবশালী বাবা-মা শিক্ষককেই উল্টো ধমকাচ্ছেন, তখন তাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে—টাকা আর ক্ষমতা থাকলে নৈতিকতার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি একটি জাতির জন্য ক্যান্সারের চেয়েও ভয়ানক।
উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের শিক্ষার্থীরা যে স্মারকলিপি দিয়েছেন, তা কেবল তাদের শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং বিদ্যমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। আমরা কি এমন এক দেশ চেয়েছিলাম যেখানে একজন শিক্ষককে বিচারপতির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে অপমান সহ্য করতে হবে?
মাননীয় বিচারপতির কাছে প্রশ্ন—আপনি কি আপনার সন্তানের এই অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছেন? নাকি তাকে এই শিক্ষা দিচ্ছেন যে, আইন আপনার পকেটে আর নৈতিকতা আপনার পায়ের নিচে?
একটি জাতি তখনই উন্নত হয় যখন তার লাইব্রেরিগুলো সমৃদ্ধ হয় এবং শিক্ষকরা নির্ভয়ে তাদের জ্ঞান বিলিয়ে দিতে পারেন। শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে না পারলে আমাদের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ফ্লাইওভার আর মেগাপ্রজেক্ট সব অর্থহীন হয়ে পড়বে। কারণ ধসে পড়া নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো মজবুত রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবে এবং শিক্ষকদের সম্মান রক্ষায় কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। অন্যথায়, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো গন্তব্য থাকবে না।
লেখক: কবি এবং প্রাবন্ধিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।