শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৩, ০৩:০৫ অপরাহ্ন

ধন্যবাদ মহামান্য রাষ্ট্রপতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম: রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২২
  • ১৫ বার পঠিত

আবদুল মান্নান

বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অত্যন্ত সফল ও সংবেদনশীল একজন মানুষ। রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর থেকেই ছিলেন সংসদ সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ আগামী বছর এপ্রিল মাসে শেষ হওয়ার কথা।

এরপর একজন নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেবেন। যদিও রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে দেশের প্রধান ব্যক্তি, তথাপি অনেকে মনে করেন রাষ্ট্রপতির তেমন কোনো কাজ নেই। তিনি শুধু কবর জিয়ারত করতে আর মিলাদ পড়তে পারেন। বাস্তবে রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান অনেক ক্ষমতা দিয়েছে, আর তিনি যদি তা পালন করতে চান, তাহলে তাঁকে বাধা দেওয়া সম্ভব নয়।

kalerkantho

সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বা আচার্য। তিনি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেন, আবার তাঁদের অসদাচরণের দায়ে অপসারণও করতে পারেন। উপাচার্য ছাড়াও উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার ও অপসারণের ক্ষমতাও তাঁর হাতে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়্যারম্যানসহ সদস্য নিয়োগও তাঁর হাত দিয়ে হয়। অবশ্য নিয়োগ বা অপসারণের ক্ষেত্রে দেশের প্রধানমন্ত্রীর একটা ভূমিকা থাকে। তবে দেখা যায়, অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকাকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেন তাঁর অত্যন্ত কাছের কিছু ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রী থেকে সত্যটা আড়াল করতে পারলে তাঁরা তাঁদের এই গণবিরোধী কাজ সহজে করতে পারেন। অতীতে এমনটি হয়েছে, এমন উদহারণ কম নয়। রেওয়াজ আছে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে পদায়ন করার আগে গোয়েন্দা প্রতিবেদন বিবেচনা করার। তা ইদানীং তেমন একটা হয় বলে মনে হয় না বা হলেও সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা হয় না। এর ফলে অনেক অযোগ্য, অদক্ষ আর অপদার্থ মানুষ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি গিয়েছিলেন দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করতে। এই সমাবর্তনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, এই সমাবর্তনই চ্যান্সেলর হিসেবে তাঁর শেষ অংশগ্রহণ। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করার এখতিয়ার একান্তভাবে তাঁর অথবা তাঁর মনোনীত অন্য কোনো ব্যক্তির। এই সমাবর্তনে তিনি কিছু উপাচার্য ও শিক্ষক সম্পর্কে বেশ কয়েকটি কঠিন সত্য কথা বলেন, যা এরই মধ্যে সাধারণ মানুষ তো বটেই, সমাবর্তনে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বেশ আলোচিত হয়েছে। তিনি অকপটে কিছু উপাচার্যের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন এবং একই সময় এটাও বলেছেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আছেন যাঁরা তাঁদের শিক্ষকতার দায়িত্বটা ঐচ্ছিক গণ্য করেন। তিনি এটাও বলেন, প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় এসব উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়ে এমন সব সংবাদ পড়তে হয়, যা চ্যান্সেলর হিসেবে তাঁকে বিব্রত ও পীড়িত করে। তিনি আরো বলেন, কিছু উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সম্মান সংকুচিত হয়ে আসছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির কোনো মন্তব্যই অতিরঞ্জিত বা অসত্য নয়। সাধারণত চ্যান্সেলর বাধ্য না হলে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা তার কর্ণধার সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করেন না। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি চ্যান্সেলর হিসেবে তা নিজের বিবেকের তাড়নায় দায়িত্ব নিয়েই কথাগুলো বলেছেন বলে ধারণা করি।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৫৩টি সরকারি ও এক শর বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। গড়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকজন শিক্ষার্থীর পেছনে পৌনঃপুনিক খাতে বছরে আনুমানিক দেড় লাখ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়, যা আসে জনগণের পকেট থেকে। উন্নয়ন খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা এর কয়েক গুণ বেশি, বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে কমবেশি হতে পারে।

এখন আসি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, যা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মানবসম্পদ তৈরি করে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যিনি চালক, তাঁর ওপর নির্ভর করে ওই বিশ্ববিদ্যালয় কোন দিকে যাবে বা তার গতিপথ কী হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চালক হিসেবে যাঁরা আসবেন তাঁদের দুটি গুণ বা যোগ্যতা থাকাটা আবশ্যিক। এই দুটির প্রথম হচ্ছে, যিনি চালকের দায়িত্ব পালন করবেন তাঁর বিদ্যায়তনিক যোগ্যতা, আর দ্বিতীয়টা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিককালে বাস্তবে এ বিষয়গুলো তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনে কখনো কোনো একটি হলের হাউস টিউটরের দায়িত্ব পালন করেননি বা তাঁর নিজের বিভাগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেননি, তিনি যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন, তাহলে সব কিছু তছনছ হয়েই যাবে। যার সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকে যদি বিমান চালাতে বলা হয়, তাতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে ঠিক তাই হবে এবং হচ্ছেও, যা মাহামান্য রাষ্ট্রপতির কথায় স্পষ্ট।

যখন পত্রপত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হয় যে অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগবাণিজ্যে লিপ্ত বা তিনি তাঁর পুত্রবধূ বা ছেলেকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য যোগ্যতার শর্ত শিথিল করেছেন, তখন তো যেকোনো মানুষই ক্ষুব্ধ হবে। আর একজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুদক যদি দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মামলা করে, তখন তো একজন শিক্ষক হিসেবে যেকোনো শিক্ষকই অসম্মানিত বোধ করতে বাধ্য। ইদানীং এমনটাই তো হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কোনো উপাচার্য যদি আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হন, তার চেয়ে লজ্জার আর কিছু তো থাকতে পারে না। কিছু অযোগ্য ব্যক্তি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ পদে পদায়িত হওয়ার ঘটনা শুধু যে বাংলাদেশে ঘটছে তা কিন্তু নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাঁরা উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন তাঁদের ৭৫ শতাংশ উপাচার্যের ওই দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা নেই বা ছিল না। বিশ্বভারতীসহ ভারতের একাধিক উপাচার্য ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে জেলে গেছেন।

এক শ্রেণির শিক্ষকের চৌর্যবৃত্তি নিয়ে এখন প্রায়ই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ উঠছে। কেউ কেউ অন্য একজনের থিসিস নকল করে ডিগ্রি অর্জন করে গায়ে বেশ হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ডিগ্রি দেখিয়ে বেশ বহাল তবিয়তে আছেন। আর একজনের লেখা নিজ নামে চালিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি তো বেশ পুরনো। এসব বিষয়ে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ জানালে তদন্তে তার প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু দোষী ব্যক্তির কোনো সাজা হতে তেমন একটা দেখা যায় না।

শিক্ষকদের সম্পর্কে মাননীয় চ্যান্সেলর সেদিন তাঁর বক্তব্যে যা বলেছেন তা সব শিক্ষকের বেলায় সত্য না হলেও অনেকের বেলায় সত্য। অনেক শিক্ষক আছেন যাঁরা নিজের মূল দায়িত্বের প্রতি এমন উদাসীন যে তাঁরা একটি সেমিস্টারে একটি বা দুটি ক্লাস নিয়ে তাঁর সেমিস্টার শেষ করেন। মাস শেষে অবশ্যই তিনি বেতন তুলতে হাজির থাকেন। এতে প্রতারিত হয় শিক্ষার্থীরা। হয়তো মৃত্যু হয় কোনো সম্ভাবনার। আবার এমন শিক্ষকরা যখন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যান তখন তিনি বাধ্য না হলে কখনো ক্লাস মিস করেন না। আর যদি কোনো কারণে করতেও হয়, তাহলে তাঁকে অন্য দিন তা পূরণ করে দিতে হয়। তবে এই ব্যবস্থা সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যাদের প্রয়োজনীয় তেমন কোনো শিক্ষক বা অবকাঠামো নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেফ সনদ বিক্রি করার কারখানা। এই খাতটি ছিল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। তাকে একটি সংগঠিত দুষ্টচক্র সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়েছে। এ বিষয়ে অন্য আরেক সময় আলোচনা করার ইচ্ছা রইল।

বঙ্গবন্ধুকন্যা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে তাঁর কেবিনেটে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী জাঁদরেল আমলা, এ এস এইচ কে সাদেক। তাঁর দক্ষতা আর প্রশাসনিক যোগ্যতা নিয়ে কোনো অভিযোগ কেউ কখনো করেনি। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাবেক শিক্ষামন্ত্রী সাদেক সাহেবের এক স্মরণসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে একবার বলেছিলেন, তাঁর সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেমনটা দুর্নীতিমুক্ত ছিল, তা এখন তেমন একটা দেখা যায় না। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাঁর মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা সম্পর্কে কি তেমন কথা বলা যাবে?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা ২০০১ সালের আগে ততটা খারাপ ছিল না। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করার পর রাতারাতি ১২ জন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজের দলের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের ওই সব পদে পদায়ন করেন। যাঁদের অনেকের ওই পদে যাওয়ার যোগ্যতা ছিল না। যাঁদের সরিয়েছেন তাঁদের বেশ কয়েকজন সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত ছিলেন। যাঁদের তিনি পদায়ন করেছিলেন তাঁদের একজন তো রাতের অন্ধকারে উপাচার্যের কক্ষের তালা ভেঙে তাঁর নতুন পদে যোগ দিয়েছিলেন। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সবাইকে পূর্ণ দায়িত্ব পালন করার সুযোগ দিয়েছিলেন।

ফিরে আসি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে। অকপটে তিনি যে সত্য কথাগুলো বলেছেন তার জন্য জাতি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। তবে তিনি তাঁর মেয়াদ শেষ করার আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার বিষয়টি নিয়ে উপযুক্ত স্থানে যদি কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে যেতে পারেন, জাতি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আপনার মধ্যে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালামের ছায়া দেখা যায়। আপনি দীর্ঘায়ু হোন। আপনার কর্মেই আপনি মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন।

 লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩
themesba-lates1749691102