বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
দেশের স্বার্থ রক্ষা করে পানি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন করা হবেঃ পানিসম্পদ মন্ত্রী সমৃদ্ধ স্বদেশ সাজানোই সরকারের স্বপ্ন-আসাদুল হাবিব দুলু এমপি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পর্যটন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে বৈঠক হান্নান মাসউদের এমপি পদ শূন্য চেয়ে হাইকোর্টে রিট ইরানের সঙ্গে সব ধরণের ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ করল সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘অধীর আগ্রহে’ দিল্লি, তথ্য নেই ঢাকার কাছে মেট্রোর দুই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক সভা শুরু কলকাতায় আবাসিক হোটেলে আগুনে ৯ মৃত্যু, ৮ জনই বাংলাদেশি তাপমাত্রা কমেছে ১০ ডিগ্রি, ম্যাকাইয়ের কন্ডিশনের সঙ্গে কি মানিয়ে নিতে পারবে বাংলাদেশ

‘অধীর আগ্রহে’ দিল্লি, তথ্য নেই ঢাকার কাছে

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চললেও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ও নয়াদিল্লির পৃথক বক্তব্যে সফর নিয়ে কূটনৈতিক জটিলতাই স্পষ্ট হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, সফর নিয়ে তাঁর কাছে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। একই দিনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, তারেক রহমানের সফরের জন্য ভারত এখনও ‘অধীর আগ্রহে’ অপেক্ষা করছে। নয়াদিল্লির মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে নতুন কোনো তথ্য নেই।

গত রোববার ঢাকার পক্ষ থেকে সফরের আগে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির কথা বলার পর দুই দেশের এমন বক্তব্য এলো। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দিল্লির আমন্ত্রণ এখনও বহাল থাকলেও সফরের সময়সূচি নির্ধারণের আগে সংবেদনশীল কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া প্রয়োজন। ফলে আলোচনার কেন্দ্র এখন শুধু সফর হবে তা নয়; বরং সফরের আগে সম্পর্কের কোন বিষয়গুলোতে অগ্রগতি হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঢাকার বড় দুটি চাওয়ার মধ্যে রয়েছে–শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তর করা। মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে কোনো আপডেট আমার কাছে নেই। প্রধানমন্ত্রীর সফর যখন যে দেশে ঠিক হবে, তাঁর অফিস থেকে আপনারা জানতে পারবেন।’ কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তাঁর বক্তব্যে সফরের সম্ভাবনা নাকচ করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, তার কোনোটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।

একই দিনে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন্য ভারত এখনও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের মর্যাদা বজায় রেখে সমঅধিকারের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে অতীতের বিষয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর ছিল। আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান জটিলতার সমাধান সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়েও একই ধরনের বার্তা আসে। মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত আন্তরিকভাবে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য বা অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেনি, কিন্তু সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার মতো কোনো অগ্রগতির কথাও জানায়নি।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে জয়সোয়াল বলেন, ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের অনুরোধ প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ভারত।

কূটনৈতিক সূত্র মতে, ভারতের এই বক্তব্যের মধ্যে একদিকে প্রত্যর্পণ ইস্যুতে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি মাত্র ইস্যুর মধ্যে আটকে না রাখার আগ্রহও রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক পুরোপুরি স্থবির করার কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি, বরং গত রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেছিলেন, সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। এ জন্য দুটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে।

ঢাকার প্রথম চাওয়া শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। দ্বিতীয়টি হলো হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তর। এ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সফর নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এসব ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে দরকষাকষি চলছে।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান, তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। এক পর্যায়ে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়ে।

এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বেছে নেননি তারেক রহমান। জুনে তিনি মালয়েশিয়া ও পরে চীন সফর করেন। কূটনৈতিক সূত্র মতে, এসব সফরের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব থাকলেও প্রথম সফর ভারতে না হওয়ায় ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের বার্তা যায়।

এ ছাড়া দিল্লির পক্ষ থেকে আসে আরেকটি আমন্ত্রণ। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানায় ভারত। ফলে দিল্লি সফরের দুটি সম্ভাবনা তৈরি হয়–আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফর অথবা ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক।

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যোগদানের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় ভারত। এর মধ্যে ভিসা ফের চালু হয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ে। কিন্তু গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের পর পরিস্থিতি আবার জটিল হয়। ওই বক্তব্যের পর ঢাকা শক্ত ভাষায় ক্ষোভ জানায়। এরপর কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ে। দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১০ আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের পাশাপাশি ঢাকার পক্ষ থেকে ‘সহায়ক পরিবেশ’-এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরে ত্রিবেদী দিল্লি গিয়ে ঢাকার বার্তা ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

এর মধ্যেই ২০-২১ আগস্ট এবং পরে ২২-২৩ আগস্টকে সম্ভাব্য সফরের তারিখ হিসেবে গণমাধ্যমে আলোচনা করা হয়। ফলে চলতি মাসেই তারেক রহমানের দিল্লি সফর হতে পারে– এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে ঢাকা সফরের আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরির শর্ত সামনে আনে।

এদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়েও দুপক্ষের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দেশটির কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নেওয়া হবে না। বাংলাদেশের অভিযোগ ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কিনা, তা আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই করা হবে।’ অন্যদিকে ঢাকা ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।

দুই দেশের সম্পর্কের অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, ভিসা, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও রয়েছে।

মঙ্গলবার রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বাড়তি জ্বালানি চাহিদা ভারতের নিজস্ব চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা ও প্রাপ্যতা বিবেচনা করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিস্তা নিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে পানি-সম্পর্কিত আলোচনা যৌথ নদী কমিশন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, দুই দেশেরই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব স্বার্থ রয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ও হাদি হত্যা মামলার আসামিদের প্রত্যর্পণের মতো বিষয় বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারত আবার এসব বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলছে এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

তারা বলেন, গতকালের তিন বক্তব্যে আপাতত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দিল্লির আমন্ত্রণ বহাল আছে, ঢাকাও সফরের সম্ভাবনা নাকচ করছে না। কিন্তু সফরের সময়সূচি নিয়ে এখনও সমঝোতা হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, আগামী কয়েক দিনে দুই দেশের যোগাযোগে সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে কতটা অগ্রগতি হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে তারেক রহমানের দিল্লি সফর কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায়।
এ বিষয়ে ভারতীয় কূটনীতি ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পর্যবেক্ষক শ্রীরাধা দত্ত সমকালকে বলেন, ‘বাংলাদেশের চাওয়া আছে, সেটা বোঝা যায়। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের আপত্তি আছে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়াও আরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। তাই দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হতে হবে। আলোচনা না হলে তো সমস্যার সমাধান হবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102