শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন

সুরা ইয়াসিনে কাঠমিস্ত্রির ঈমানজাগানিয়া বিবরণ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। অধিকাংশ মানুষ তখন নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়; কিন্তু আল্লাহর সত্যিকার বান্দারা ভয়কে জয় করে সত্যের পাশে দাঁড়ান।

তাঁদের কাছে জীবন যতটা মূল্যবান, ঈমান তার চেয়েও বেশি মূল্যবান। এমনই এক বিস্ময়কর মুমিনের গল্প বর্ণিত হয়েছে সুরা ইয়াসিনে। ইতিহাসে তিনি হাবিব নাজ্জার নামে পরিচিত।
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে দুইজন রাসুল একটি জনপদে আগমন করেন।

কিন্তু জনপদবাসী তাঁদের অস্বীকার করে। এরপর আল্লাহ তাআলা তৃতীয় একজন রাসুলের মাধ্যমে তাঁদের শক্তিশালী করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের কাছে সেই জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করো, যখন সেখানে রাসুলগণ এসেছিল।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ১৩)
তারপর রাসুলরা তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের প্রতি প্রেরিত-রাসুল।

(সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ১৪)
কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাঁদের বলল, ‘তোমরা তো আমাদেরই মতো মানুষ। রহমান কিছুই অবতীর্ণ করেননি; তোমরা শুধু মিথ্যা বলছ।’ তখন রাসুলরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘আমাদের প্রতিপালক জানেন, আমরা অবশ্যই তোমাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। আর আমাদের দায়িত্ব তো শুধু সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ১৫–১৭)

এভাবে রাসুলদের প্রতি জনপদবাসীদের বিরোধিতা ক্রমেই তীব্র হতে লাগল।

তারা তাঁদের অমঙ্গলের কারণ বলে মনে করল এবং হুমকি দিল, ‘আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আসবে।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ১৮)
রাসুলরা উত্তরে বললেন, ‘তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই সঙ্গে। তোমাদের উপদেশ দেওয়া হচ্ছে বলেই কি তোমরা এমন কথা বলছ? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ১৯)

একপর্যায়ে চারিদিকে যখন সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ প্রকট আকার ধারণ করে। এবং পুরো সম্প্রদায় আল্লাহর প্রেরিত রাসুলদের বিরুদ্ধাচারণ করতে শুরু করে এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে কোরআন আমাদের সামনে সেই মহান মুমিন ব্যক্তির কথা তুলে ধরে যিনি একাই তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান করেন। আল্লাহ বলেন, ‘শহরের দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা রাসুলদের অনুসরণ করো।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২০)

তাফসিরের বহু গ্রন্থে এই ব্যক্তির নাম ‘হাবিব নাজ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘হাবিব’ তাঁর নাম আর ‘নাজ্জার’ অর্থ কাঠমিস্ত্রি। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি হওয়ায় তাঁকে ‘নাজ্জার’ বলা হয়। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের মুমিন, যিনি নিজের সম্প্রদায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর রাসুলদের অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের সামনে যুক্তি তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা তাদের অনুসরণ করো, যারা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চায় না এবং যারা সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২১)

এরপর তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন, ‘যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যাঁর কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে, আমি কেন তাঁর ইবাদত করব না?’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২২)

কী অসাধারণ প্রশ্ন! যিনি সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন এবং মৃত্যুর পর যার কাছেই ফিরে যেতে হবে—ইবাদতের অধিকার তো একমাত্র তাঁরই। হাবিব নাজ্জার আরও বললেন, ‘আমি কি তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য উপাস্য গ্রহণ করব? রহমান যদি আমার ক্ষতি করতে চান, তাদের সুপারিশ আমার কোনো কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে উদ্ধারও করতে পারবে না।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২৩)

এরপর তিনি নিজের ঈমানের ঘোষণা দিলেন, ‘আমি তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি। অতএব তোমরা আমার কথা শোনো।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২৫)

হাবিবের এই সাহসী বক্তব্যের পর তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে হত্যা করে। ফলে তিনি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। তারপরের ঘটনা হলো। ‘তাঁকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২৬)
কিন্তু তিনি জান্নাতে প্রবেশের সংবাদ পেয়েও তাঁর চিন্তা নিজের জন্য ছিল না। তাঁর মুখ থেকে বের হলো, ‘হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানত—আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন!’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২৬–২৭)

কী অপূর্ব হৃদয়! যারা তাঁকে হত্যা করেছে, তাদের প্রতিও তাঁর অন্তরে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা নেই। বরং তিনি চান তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষও যেন সত্য উপলব্ধি করে জান্নাতের পথে ফিরে আসে। অথচ আজ আমরা সামান্য মতবিরোধে আপনজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করি, সামান্য বিরোধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠি। অথচ একজন মুমিনের হৃদয় কেমন হওয়া উচিত—হাবিব নাজ্জারের ঘটনা তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

এরপর আল্লাহ বলেন, ‘তার পর তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমি আকাশ থেকে কোনো বাহিনী পাঠাইনি এবং বাহিনী পাঠানোর প্রয়োজনও আমার ছিল না। শুধু একটি প্রচণ্ড শব্দ হলো, ফলে তারা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ২৮–২৯)

সুরা ইয়াসিনের এই ঘটনা আমাদের সামনে এক অনন্য ঈমানি চরিত্রের ছবি আঁকে। একজন সাধারণ মানুষ—ক্ষমতা নেই, বাহিনী নেই, কোনো পার্থিব প্রভাব নেই; কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল অটুট ঈমান। তাই তিনি একাই ছুটে এসেছিলেন সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে।

আজ সত্যের পথে চলতে গিয়ে আমরা যদি উপহাস, বিরোধিতা কিংবা নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হই, তাহলে হাবিব নাজ্জারের কথা স্মরণ করা উচিত। তিনি জানতেন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য তাঁর জীবন হতে পারে; তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। আর তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—নিজে জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়ার পরও তিনি নিজের সম্প্রদায়ের মুক্তির কথা ভুলে যাননি। (তথ্যসূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে তবারি, তাফসিরে কুরতবি)

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102