প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’ প্রজাপতি হলে সুরে সুরে প্রশ্ন করা যেতো। কিন্তু তেলাপোকা প্রজাপতির মত বর্ণিলও নয়, রোমান্টিকও নয়।
প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’ প্রজাপতি হলে সুরে সুরে প্রশ্ন করা যেতো। কিন্তু তেলাপোকা প্রজাপতির মত বর্ণিলও নয়, রোমান্টিকও নয়।
ককরোচ জনতা পাটির ক্ষোভ নিছক সরকারের বিরুদ্ধে নয়, সিস্টেমের বিরুদ্ধে। তরুণদের অভিযোগ, এই সিস্টেম তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে না। প্রচলিত রাজনীতিতে তাদের জন্য স্পেস নেই বললেই চলে। শুধু ভারত নয়, ককরোচ পার্টির অবিশ্বাস্য উত্থান থেকে শেখার আছে বিশ্বের সব দেশেরই। কারণ বিশ্বের সব দেশের তরুণদের মধ্যেই কমবেশি হতাশা, অপ্রাপ্তি, ক্ষোভ আছে। কখনো কখনো অভিজিত দীপকের মত কেউ সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালেন। অধিকাংশ সময় সেই আগুন বয়সের সাথে সাথে আপনা আপনিই মিইয়ে যায়।
যুগে যুগে দেশে দেশে তরুণরা তাদের ক্ষোভের আগুনে প্রচলিত অনেক সিস্টেমকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। উদাহরণ পেতে ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে হবে না। ঘরের কাছেই বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালে তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে তারা কি করতে পারে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো বছরের পর বছর ধরে যা করতে পারেনি, তরুণরা কয়েকদিনেই তা করে চমকে দিয়েছে সবাইকে।
বাংলাদেশের ২৪এর জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের ককরোচ পাটির আন্দোলনের অনেকটাই মিল আছে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারি চাকরির প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের তুলনা করেছিলেন। তাতেই চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে থাকা তরুণরা ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে মধ্যরাতে রাস্তায় নামলো। আন্দোলন পেলো নতুন গতি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে তরুণদের কাউকে কাউকে তেলাপোকা বলে তুচ্ছ করেছিলেন। ‘ম্যায় হু ককরোচ’ বলে পরদিনই অনলাইনে তৈরি হয়ে গেল ককরোচ জনতা পাটি। এবার আন্দোলনের ইস্যুটা মিলিয়ে দেখুন। বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। ককরোচ পাটির প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভটা হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে।
সম্প্রতি ভারতে নিট পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষায় নানাবিধ সংকটের প্রতিবাদেই তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে। তবে সমস্যাটা নিছক শিক্ষামন্ত্রীর নয়। এটাই আসলে সিস্টেমের সংকট। সিজেপির অবিশ্বাস্য উত্থানের আরেকটি বড় কারণ বাড়তে থাকা বেকারত্ব। ভারতে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের ২৯ ভাগই কাজ পাচ্ছে না। আর এই ‘অলস বেকারদের’ই ডাক দিয়েছে তেলাপোকাদের দল। পড়াশোনা শেষ করে ঠিকঠাক চাকরি না পেলে তরুণরা ক্ষুব্ধ হবেনই। এটা বিশ্বের সব দেশেরই বাস্তবতা। তবে ভারত-বাংলাদেশের মত জনবহুল দেশে বেকারত্বের হার বেশি, তাই ক্ষুব্ধ তরুণের সংখ্যাও বেশি। ভারতে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে নামে। চাকরির জন্য তারা বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেয়। দারুণ প্রতিযোগিতামূলক এসব পরীক্ষা নিয়ে তাদের অভিযোগের অন্ত নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নাম্বার দেওয়ায় ভুল, নানান কারিগরি ত্রুটি শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে। উলটো করে ভাবুন, পরীক্ষা পদ্ধতি যদি একদম ঠিকও হয়ে যায়, ক্ষুব্ধ তরুণের সংখ্যা কিন্তু কমবে না। কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে সিস্টেম ঠিক করলেও বেকারদের সংখ্যা একই থাকবে। তাই বেকার, ক্ষুব্ধ, নিজেদের বঞ্চিত মনে করা তারুণ্যের মধ্যে বিক্ষোভের আগুন জ্বালানোটা কঠিন নয়।
তবে কঠিন হলো, সেই আগুনটাকে ঠিকঠাকমত কাজে লাগানো। আগুনে সবকিছু পুড়ে যাওয়াও সম্ভব। আবার আগুনে পুড়েই সোনা আরও খাঁটি হয়। সিজেপি বলছে, তাদের আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে নয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের শুরুটাও সরকার পতনের দাবিতে ছিল না।
একযুগ ধরে বিজেপি সরকার ভারত শাসন করছে। যত দিন যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী যেন আরও শক্তি সঞ্চয় করছেন, নতুন নতুন রাজ্য জয় করছেন। বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত সর্বভারতীয় কোনো শক্তি দেখা যাচ্ছে না। তেলাপোকাদের উত্থান তাই বিজেপি বিরোধী শিবিরে আশার সঞ্চার করেছে। তাই তো বিরোধী জোট ’ইন্ডিয়া’ তাদের সুরে সুর মেলায়।
তবে বাংলাদেশ বা নেপাল আর ভারতের রাজনৈতিক চিত্র এক নয়। বাংলাদেশ আর নেপাল এত ছোট, এক বিক্ষোভেই সরকার কাবু হয়ে গেছে। কিন্তু ভারত এত বড়, দিল্লীর যন্তর মন্তরের আন্দোলনের উত্তাপ অরুণাচলে পৌঁছাবেই না হয়তো। ভারতের ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে নিছক জলোচ্ছ্বাসে কাজ হবে না, সবগ্রাসী সুনামি লাগবে। তবে সিজেপিই বলছে, তারা বিজেপিকে উৎখাত করতে মাঠে নামেনি। তারা যদি সিস্টেমের ত্রুটিগুলো সারাতে পারে, তরুণদের মনে যদি বঞ্চনার বোধ কমে আসে; তাও তো কম প্রাপ্তি নয়।
তবে শঙ্কাও আছে। নেপালের বিপ্লবীরা নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই হতাশা ভর করেছে। আর বাংলাদেশের তরুণরা তো নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতার অংশীদার হয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে আন্দোলনের মূল চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের তরুণদের দাবি যৌক্তিক ছিল, বিক্ষোভ তীব্র ছিল। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, সেই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে ডিপ স্টেট পেছন থেকে আন্দোলনকে পরিচালনা করেছে। আন্দোলন পরবর্তী ক্ষমতাসীনরাই স্বীকার করেছেন, এ আন্দোলন ছিল ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’এর অংশ। ভারতের তেলাপোকাদের ওড়ার পেছনেও ডিপ স্টেটের কৌশল আছে কিনা, কে জানে। তেলাপোকারা পাখায় পাওয়া শক্তিতে উড়ে উড়ে ক্ষমতা কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে, নাকি তাদের ক্ষেত্রে ‘পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে’টাই সত্যি হয়; সেটা জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।