বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২০ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
সাংস্কৃতিক ক্ষয়িষ্ণুতা ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব: সার্বভৌমত্বের অন্তিম সংকটের রূপরেখা – ডক্টর দিপু সিদ্দিকী উত্তরা নিউজের লোগো ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার, থানায় জিডি স্পীকারের সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ ডেপুটি স্পিকারের এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেলেন মীর্জা সালমান সংসদ কমিটির ৩য় বৈঠক, নানা এজেন্ডা উত্থাপন ডিএমপি উত্তরা বিভাগের নতুন ডিসি মির্জা তারেক আহমেদ বেগ জমি থেকে শ্যালোমেশিন সরিয়ে না নেওয়ায় হত্যা জ্বালানি তেলের দাবিতে ইউএনও অফিসের সামনে জেলেদের অবস্থান চাঁদপুরে বালতির পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু প্রাইভেট কারের ধাক্কায় রিকশায় খুলনা ভার্সিটির ছাত্রী নিহত

সাংস্কৃতিক ক্ষয়িষ্ণুতা ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব: সার্বভৌমত্বের অন্তিম সংকটের রূপরেখা – ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের প্রাত্যহিক জনজীবনে ফুটপাত থেকে রাজপথ, বাসস্ট্যান্ড থেকে অফিস আদালত—সর্বত্র যে চিত্রটি আজ ধ্রুব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো চরম বিশৃঙ্খলা এবং অপরের অধিকার লুণ্ঠনের এক আদিম মহোৎসব। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের ‘বানরের আয়না’ গ্রন্থে বর্ণিত সেই ‘চৌর্যপরজীবী’ বা ক্লিপ্টোপ্যারাসাইটিক মানসিকতা এখন কেবল আমলাতন্ত্রে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো কীভাবে আমাদের এই প্রাত্যহিক অনৈতিক আচরণ, সামাজিক অসমতা এবং নৈতিকতাহীন শিক্ষা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে এবং ‘ডিপ স্টেট’-এর পথ প্রশস্ত করে, তার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ করা।

১. প্রাত্যহিক অনাচার: মনস্তাত্ত্বিক বিকারের বহিঃপ্রকাশ
রাস্তায় হাঁটার সময় যখন একজন ব্যক্তি তার সামনের মানুষটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় কিংবা বাসে ওঠার জন্য মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তখন সেটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বিশৃঙ্খলা নয়। এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিকার। এই আচরণের মূলে রয়েছে ‘কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে’ পৌঁছানোর এক উম্মাদনা, যেখানে পাশের মানুষটি সহযাত্রী নয় বরং প্রতিপক্ষ।
এই যে রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিলাসবহুল প্রাইভেট কারের মালিক পর্যন্ত সবাই ট্রাফিক আইন ভেঙে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগে যেতে চান, এটি নির্দেশ করে যে আমাদের ভেতরকার ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) ভেঙে পড়েছে। যখন কোনো সমাজে নিয়ম মেনে চলাকে ‘বোকামি’ এবং আইন ভাঙাকে ‘স্মার্টনেস’ হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই সমাজের নাগরিকরা আর একটি সংহতিবদ্ধ জাতি হিসেবে থাকে না। তারা পরিণত হয় কতগুলো বিচ্ছিন্ন এবং স্বার্থপর ইউনিটে। এই বিচ্ছিন্নতাই একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করার প্রথম ধাপ।
২. নৈতিকতাহীন শিক্ষা ও অশুভ প্রতিযোগিতা
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা জিপিএ-৫ কিংবা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার এক যান্ত্রিক কারখানায় পরিণত হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা ও মানবিকতার স্থান এখন গৌণ। ফলে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষিত হয়ে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন তার কাছে সাফল্য মানেই হলো ‘বৈভব নিজ আয়ত্তে আনা’।
শিক্ষা যখন কেবল আর্থিক অভিলাষের সিঁড়ি হয়, তখন ছাত্ররা শেখে কীভাবে অন্যকে ল্যাং মেরে উপরে উঠতে হয়। এই অসম প্রতিযোগিতা সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে এক বিশাল মানসিক পরিখা তৈরি করে দিয়েছে। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মেধাবী তরুণটি যখন দেখে যে সততা দিয়ে এ সমাজে টিকে থাকা অসম্ভব, তখন সে তার ‘সারভাইভাল ইনস্টিঙ্কট’ বা টিকে থাকার তাড়নায় নীতি বিসর্জন দেয়। এই নৈতিক স্খলনই একসময় মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বর্ণিত ‘বেনজীর’ সিনড্রোম তৈরি করে।
৩. সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা: অবিচারের চাষাবাদ
সমাজে যখন সম্পদের সুষম বণ্টন থাকে না এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকট হয়, তখন সেখানে জিঘাংসা তৈরি হয়। একটি মামুলি প্রাইভেট কারের মালিককে দেখে যখন একজন নিঃস্ব পথচারীর মনে হিংসে জাগে, তখন বুঝতে হবে সমাজটি একটি টাইম বোমার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এই অর্থনৈতিক অবিচার মানুষকে ‘প্রতিশোধবাদী ক্ষমতালিপ্সু’ করে তোলে। যারা আজ বঞ্চনার শিকার, তারা সুযোগ পেলেই সেই ক্ষোভ উগরে দেয় অন্যের ওপর। এই প্রতিশোধমূলক মানসিকতা যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বা প্রশাসনে গিয়ে বসে, তখন তারা রাষ্ট্রকে নিজের জমিদারি মনে করতে শুরু করে। ফলে দুর্নীতি তখন আর ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আচার।
৪. ডিপ স্টেট এবং সার্বভৌমত্বের হুমকি: একটি রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণ
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, রাস্তার ধাক্কাধাক্কি বা দুর্নীতি কীভাবে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কিংবা ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলে? এর উত্তর নিহিত রয়েছে ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া-রাষ্ট্রের ধারণার মধ্যে।
ক. প্রশাসনিক কাঠামো ধ্বংস ও ছায়া-রাষ্ট্রের উত্থান:
যখন কোনো দেশের সিভিল সার্ভিস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় অংশ ‘ভীতু জন্তু’ বা ‘মেন্টালি করাপ্ট’ হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব চরিত্র হারায়। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল পর্দার আড়াল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করে। এটিই ‘ডিপ স্টেট’। যখন একজন পদস্থ কর্মকর্তা নিজের পদের অমর্যাদা করে অবৈধ সম্পদ অর্জনে মগ্ন থাকেন, তখন তিনি আর রাষ্ট্রের অনুগত থাকেন না; তিনি হয়ে পড়েন সেই শক্তির দাসে যারা তার অপরাধকে ঢেকে রাখে।
খ. জাতীয় সংহতি ও ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব:
সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রের সীমানা রক্ষা নয়, এটি জনগণের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছার প্রতিফলন। যখন প্রতি পদে পদে একজন নাগরিক অন্য নাগরিকের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়, যখন অনৈতিকতা স্বাভাবিক রূপ লাভ করে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি কোনো মমত্ববোধ থাকে না। একটি আদর্শহীন ও নৈতিকতাহীন জাতিকে বহিঃশত্রু খুব সহজেই পরাস্ত করতে পারে। ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, কারণ সেই ভূখণ্ডকে রক্ষা করার মতো কোনো ‘জাতীয় চরিত্র’ অবশিষ্ট থাকে না।
গ. অর্থনৈতিক পরাধীনতা:
দুর্নীতি ও অনৈতিকভাবে বৃত্ত-বৈভব অর্জনের ফলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। এই অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ রাষ্ট্রকে বিদেশের কাছে ঋণী ও মুখাপেক্ষী করে তোলে। যখন একটি রাষ্ট্র আর্থিকভাবে পরাধীন হয়, তখন তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও অন্যের হাতে চলে যায়। সার্বভৌমত্ব তখন কেবল একটি কাগজে-কলমে থাকা শব্দে পরিণত হয়।
৫. মুক্তি ও প্রতিরোধের পথ: একটি পরিবারকেন্দ্রিক বিপ্লব
এই ভয়াবহ গন্তব্য থেকে ফিরতে হলে আমাদের একদম গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।
পারিবারিক শিক্ষা: নৈতিকতার প্রথম পাঠ হতে হবে পরিবার থেকে। একজন সন্তান যেন ছোটবেলা থেকেই শেখে যে অন্যের অধিকার হরণ করে বড় হওয়া গৌরবের নয়, বরং লজ্জার।
শিক্ষাক্রমের আমূল পরিবর্তন: শিক্ষাকে কেবল চাকরির বাজারমুখী না করে মানবিক ও নৈতিক অর্জনের মানদণ্ড বানাতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে আচরণগত উৎকর্ষকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
অসম প্রতিযোগিতার নিরসন: রাষ্ট্রকে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ সুযোগ-সুবিধা যেমন চিকিৎসা ও পরিবহনের ক্ষেত্রে যদি বৈষম্য কমে আসে, তবে মানুষের ভেতরকার ‘হায়েনা মানসিকতা’ হ্রাস পাবে।
সাহসী নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতা: প্রশাসনের ভয় দূর করতে হবে। নির্ভীক ও নির্মোহ চাকরিজীবীদের জন্য অভয় আশ্রম গড়ে তুলতে হবে। বেনজীর হওয়ার পরিবর্তে ‘মানুষ’ হওয়ার আদর্শকে সামাজিকভাবে পুরস্কৃত করতে হবে।
উপসংহার
আমরা যদি আজ রাস্তার এই অমানবিক আচরণকে তুচ্ছ ভেবে এড়িয়ে যাই, তবে আমরা মূলত আমাদের নিজেদের পরাজয়ের দলিল লিখছি। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বিশ্লেষণ আমাদের সতর্ক করে দেয় যে—যদি আমরা আমাদের মনস্তত্ত্ব থেকে এই অনৈতিকতা এবং জিঘাংসা দূর করতে না পারি, তবে কোনো বহিঃশত্রুর প্রয়োজন হবে না; আমরা নিজেরাই নিজেদের রাষ্ট্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেব।
ডিপ স্টেট কোনো আকাশ থেকে পড়া আপদ নয়, এটি আমাদের নৈতিক দেউলিয়াপনার ফল। আপনি যখন অন্যের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মরিয়া হন, তখন জেনে রাখবেন, আপনি নিজের অজান্তেই নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কোনো অশুভ শক্তির হাতে তুলে দিচ্ছেন। পরাধীন হওয়ার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, নৈতিকতাহীন একটি সমাজই যথেষ্ট। তাই রাষ্ট্র বাঁচাতে হলে আগে নিজের ভেতরের ‘মানুষ’টিকে বাঁচাতে হবে। অন্যথা, মানচিত্র থাকবে, ভূখণ্ড থাকবে—কিন্তু আমরা থাকবো এক বিশাল কারান্তরালে, যেখানে আমাদের কোনো সার্বভৌমত্ব থাকবে না।
লেখক: ডক্টর দিপু সিদ্দিকী শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক এবং ডিন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102