ভারতে সাবেক সেনাপ্রধানের স্মৃতিকথার উদ্ধৃতি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
রিপোর্টারের নাম
-
আপডেট টাইম:
বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সংসদে সাবেক এক সেনাপ্রধানের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে অংশ উদ্ধৃত করার চেষ্টা করলে তীব্র হৈচৈ সৃষ্টি হয়। ওই স্মৃতিকথায় ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে সামরিক অচলাবস্থার সময় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনার ঘাটতির অভিযোগ তোলা হয়েছেএই অভিযোগ করা হয়েছে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত বই ফোর স্টারস অব ডেস্টিনি-তে, যা ২০২৪ সাল থেকে সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং অন্তত চারজন চীনা সেনা নিহত হন।এই দাবিগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয় এবং সংসদের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বুধবার আলোচনার সময় গান্ধী বইটি থেকে পড়তে গেলে বারবার তাঁকে বাধা দেওয়া হয়।পরে তিনি বলেন, স্মৃতিকথায় দাবি করা হয়েছে, চীনা ট্যাংক ভারতীয় অবস্থানের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় নারাভানেকে বলা হয়েছিল ‘তিনি যা উপযুক্ত মনে করেন, তাই করতে’।২০২০ সালের গ্রীষ্মে লাদাখের গালওয়ান নদী উপত্যকায় বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।১৯৭৫ সালের পর এটিই ছিল দুই দেশের প্রথম প্রাণঘাতী মুখোমুখি সংঘর্ষ।বহু বছর ধরে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার পর ২০২৪ সালে উত্তেজনা কমে আসে। উভয় পক্ষই প্রভাবিত সীমান্ত এলাকায় সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি অভিযোগ করেছে, গান্ধী ভারতীয় সেনাদের অপমান করেছেন এবং অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সংসদীয় বিধি লঙ্ঘন করেছেন।এ বিতর্ক নিয়ে নারাভানে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।গত সপ্তাহান্ত থেকে ভারতে স্মৃতিকথাটি শিরোনাম হচ্ছে, দ্য ক্যারাভান ম্যাগাজিন একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করার পর। প্রবন্ধটিতে বলা হয়, এতে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থেকে নেওয়া অংশ রয়েছে।সোমবার সংসদের নিম্নকক্ষে আলোচনার সময় গান্ধী প্রবন্ধটির ফটোকপি থেকে অংশ পড়ার চেষ্টা করেন।তিনি বলেন, ‘এটি সেই সময়ের কথা, যখন চারটি চীনা ট্যাংক ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করছিল’, এরপর তাকে আর কথা বলতে দেওয়া হয়নি।সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, তিনি কংগ্রেস নেতাদের জানিয়েছিলেন যে গান্ধী তার বক্তব্য চালিয়ে যেতে পারেন। তবে তিনি যোগ করেন, ‘সাবেক সেনাপ্রধান যা বলেননি, যা সত্য নয় এবং যা বিধি অনুযায়ী অনুমোদিত নয়—তা সংসদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।’এটি চীন ইস্যুতে সরকারের সমালোচনায় গান্ধীর প্রথম ঘটনা নয়। ২০২০ সালের অচলাবস্থার সময় মোদি সরকার চীনের কাছে ভারতীয় ভূখণ্ড ‘হস্তান্তর করেছে’—এমন অভিযোগ তিনি একাধিকবার করেছেন। সরকার এসব অভিযোগ কঠোরভাবে নাকচ করে জানিয়েছে, কোনো জমি হারানো হয়নি।সোমবার সংসদে নারাভানের স্মৃতিকথা নিয়ে গান্ধীর বক্তব্যের সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপি সদস্যরা প্রতিবাদ জানান। তারা অভিযোগ করেন, অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে গান্ধী সংসদীয় বিধি ভেঙেছেন এবং সংসদকে বিভ্রান্ত করছেন।প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘রাহুল গান্ধীর উচিত সংসদের সামনে সেই বইটি উপস্থাপন করা, যেখান থেকে তিনি উদ্ধৃতি দিচ্ছেন, কারণ তিনি যে বইয়ের কথা বলছেন, সেটি এখনো প্রকাশিত হয়নি।’গান্ধী বলেন, তার সূত্র ‘বিশ্বাসযোগ্য’ এবং সেখান থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার অধিকার তার রয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডার কারণে সোমবার দিনের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়।তবে গান্ধী আবার বিষয়টি উত্থাপনের চেষ্টা করলে মঙ্গলবারও বিঘ্ন অব্যাহত থাকে। তাকে ফের থামানো হলে বিরোধী নেতাদের নতুন করে প্রতিবাদ শুরু হয়। পরে বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে কংগ্রেসের আটজন সাংসদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।বুধবার সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে গান্ধী অপ্রকাশিত বইটির একটি কপি দেখিয়ে বলেন, বইটির অস্তিত্ব নেই—রাজনাথ সিংয়ের এমন বক্তব্য সত্য নয়।তিনি বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘চীনা সেনারা শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়া ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তাদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশ ছিল।’গান্ধীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সেনাপ্রধান বারবার রাজনাথ সিংকে ফোন করলে তিনি মোদির কাছ থেকে এমন বার্তা দেন, যাতে কার্যত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নারাভানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।গান্ধী নারাভানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমি নিজেকে খুব একা মনে করেছিলাম। পুরো ব্যবস্থাই আমাকে পরিত্যাগ করেছিল।’ তিনি যোগ করেন, এতে প্রমাণ হয় ‘লাদাখ সংকটে প্রধানমন্ত্রী মোদি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন’।নারাভানে কে এবং তার বইটি কী নিয়েনারাভানে ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ভারতের সেনাপ্রধান ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মজীবন নিয়ে তার স্মৃতিকথাটি ২০২৪ সালে প্রকাশ পাওয়ার কথা থাকলেও, সামরিক অচলাবস্থার সংবেদনশীল কার্যক্রমগত তথ্য থাকার প্রতিবেদনের কারণে প্রকাশ বিলম্বিত হয়েছে।প্রকাশ বিলম্বের কারণ প্রকাশক আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে গত বছরের এপ্রিল মাসে নারাভানে একটি হিন্দি ইউটিউব চ্যানেলকে বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে।তিনি বলেন, ‘আমার কাজ ছিল বইটি লেখা ও প্রকাশকের কাছে দেওয়া। এখন সেটি এগিয়ে নেওয়া তাদের দায়িত্ব।’বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এমন কোনো তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা ভারতের ‘সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা’কে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধরনের প্রকাশনার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।চলতি সপ্তাহে ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলে অবসরপ্রাপ্ত সেনা জেনারেল কেজেএস ধিল্লন বলেন, কোনো কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি কার্যক্রমগত বিবরণসমৃদ্ধ বই প্রকাশ করতে চান, তবে পাণ্ডুলিপি সেনা সদর দপ্তরে জমা দিতে হয়।এর পর তিন ধরনের সিদ্ধান্ত হতে পারে—সংবেদনশীল তথ্য না থাকলে অনুমোদন, উদ্বেগ থাকলে লেখকের সঙ্গে আলোচনা, অথবা জাতীয় নিরাপত্তা বা কার্যক্রমগত পরিকল্পনার ঝুঁকি থাকলে প্রত্যাখ্যান।নারাভানে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষ নিয়ে লেখালেখি করা প্রথম অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নন।২০০৬ সালে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ভিপি মালিক ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ নিয়ে একটি বিবরণ প্রকাশ করেন। ধিল্লনও ভারতশাসিত কাশ্মীরে শীর্ষ সামরিক কমান্ডার হিসেবে তার দায়িত্বকাল নিয়ে লিখেছেন, পাশাপাশি ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামরিক উত্তেজনা নিয়েও একটি আলাদা বই প্রকাশ করেছেন।
নিউজটি শেয়ার করুন..
-
-
-
- Print
- উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..