বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
আ.লীগ সমঝোতা চাইলে আগে অপরাধ স্বীকার করতে হবে দুর্গাপুরে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত কাশেম গ্রেপ্তার ফ্যাসিস্ট হাসিনা যা বলে তা কখনো করে না : আমানউল্লাহ আমান মাঠে মাঠে সতেজ আগাম সবজি, বন্যার ক্ষতি কাটানোর স্বপ্ন মেসির বিদায়ী ভাষণে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এনজো ড্রোন হামলা ঠেকাতে পাকিস্তানের ভরসা মাছ ধরার জাল এই মাঠ ছাড়তে চাই না, শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি: মেসি টঙ্গীতে চুরির অভিযোগে দুই ভাইকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশুদের সুরক্ষায় ২২ জেলায় হচ্ছে ‘শিশু স্বর্গ’: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না-খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপি

ড্রোন হামলা ঠেকাতে পাকিস্তানের ভরসা মাছ ধরার জাল

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬

আকাশ থেকে বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের হামলা এখন পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পুলিশ চেকপোস্ট ও নিরাপত্তা স্থাপনাগুলোতে এমন হামলার ঘটনা ঘটছে। সীমিত অর্থ ও সরঞ্জামের মধ্যে এসব হামলা মোকাবিলায় স্থানীয় পুলিশ বেছে নিয়েছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতি। মাটির কয়েক মিটার ওপরে চেকপোস্টের ছাদ ও সীমানাপ্রাচীরের মাঝখানে মাছ ধরার জাল টাঙিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এক ধরনের আচ্ছাদন।

হাঙ্গু জেলার সারকি পিয়ালা পুলিশ চেকপোস্টে গত ১৬ এপ্রিল বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলার সময় পুলিশ কর্মকর্তা ফায়াজ খান ও তাঁর সহকর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেন। আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের ওই চেকপোস্টে হামলার সময় তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধারা চারপাশ থেকে গুলি চালায়। টিটিপি পরে হামলার দায় স্বীকার করে।

৪০ বছর বয়সী পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ খান জানান, প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। এতে একটি সাঁজোয়া যানের চালক নিহত এবং একজন কনস্টেবল আহত হন। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ওই সময় তীব্র আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। এমনকি জীবিত বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত ছিলেন না।

এ ধরনের হামলা মোকাবিলায় হাঙ্গু পুলিশ চেকপোস্টের ওপর মাছ ধরার জাল টাঙানোর উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ জেলেদের ব্যবহৃত জালের মতো দেখতে এই জাল প্রথম বসানো হয় দুই মাস আগে। এরপর থেকে সারকি পিয়ালা চেকপোস্টে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

ফায়াজ খান বলেন, কোনো ড্রোন চেকপোস্টের ওপর দিয়ে উড়ে এলে সেটি জালে আটকে অকেজো হয়ে যেতে পারে। আর ড্রোনটি জালে আটকে না পড়ে ওপরেই বিস্ফোরিত হলেও বিস্ফোরণের ধাক্কা ও ছড়িয়ে পড়া ধাতব টুকরোর ক্ষতি কিছুটা কমতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের মাথার ওপর দড়ি ও তারের সাহায্যে কালো জালটি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে।

হাঙ্গু জেলার পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব জানান, প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি বা ১ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলারে একটি সাধারণ চেকপোস্ট এ ধরনের জাল দিয়ে আচ্ছাদিত করা যায়। ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলার প্রভাব কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ থানা ও চেকপোস্টগুলোতে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পুরো জেলায় আরও কয়েকটি থানায় জাল বসানোর কাজ চলছে।

এই কর্মসূচি সম্প্রসারণে হাঙ্গু পুলিশ প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানসহ আরও অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলার চেকপয়েন্ট ও পুলিশ পোস্টে এ ধরনের জাল বসানো হয়েছে। প্রদেশের কিছু এলাকায় সামরিক চৌকিতেও ড্রোন-প্রতিরোধী জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।সরকারি সেবা

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার কৌশল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বন্দুক ও মর্টারের পাশাপাশি তারা এখন ড্রোন ও কোয়াডকপ্টারও ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বেড়েছে, যার অন্যতম লক্ষ্য পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এসব হামলার অনেকগুলোর দায় টিটিপি স্বীকার করেছে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে টিটিপিকে নিজেদের ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তবে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং হামলাগুলোকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হাঙ্গু এলাকায় এ ধরনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি ঘটে ২৯ জুলাই। ওই দিন বোমা-যুক্ত কোয়াডকপ্টার দিয়ে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার পর স্থল হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। দীর্ঘ ওই হামলায় ১৫ হামলাকারীও নিহত হয়। টিটিপি এ হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে আরেকটি গোলাগুলির ঘটনায় ছয় সেনা ও আট হামলাকারী নিহত হন। এর দুদিন আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাট জেলায় সমন্বিত হামলায় ‘ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ১৬ পুলিশ সদস্যসহ মোট ২৩ জনকে হত্যা করে এবং একটি মসজিদে বোমা হামলা চালায়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে এলাকাটি প্রদেশের অন্যতম সংবেদনশীল জেলায় পরিণত হয়েছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান জানান, মাছ ধরার জাল বসানোর পর থেকে সারকি পিয়ালা ও কাছের বালিয়ামেনা চেকপোস্টে ড্রোন বা কোয়াডকপ্টারের মাধ্যমে আর কোনো হামলা হয়নি।

জিশান খান বলেন, জালগুলো পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘নিরাপত্তার একটি বাড়তি স্তর’ হিসেবে কাজ করছে। কোনো হামলা হলে এই ব্যবস্থা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে বলে তাঁর ধারণা। তাঁর হিসাবে, এতে ক্ষয়ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল বলেন, নির্দিষ্ট কিছু স্থানে জাল বসানো একটি অপরিপক্ব ও সস্তা কৌশল হতে পারে। কারণ সবসময় পুলিশ চেকপোস্টই যে হামলার লক্ষ্য হবে, এমন নয়। তাঁর মতে, ড্রোন হামলার উদ্দেশ্য অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আঘাত করে ব্যাপক আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা।

পেশোয়ারভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিদা আদিল বলেন, মাছ ধরার জাল ব্যবহারের ধারণাটি পুরোপুরি নতুন নয়। সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ক্যামোফ্লেজ নেট বা ছদ্মবেশী জাল থেকেই এমন ধারণা এসেছে। ইউক্রেনেও রুশ ড্রোন প্রতিহত করতে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের জাল ব্যবহারের নজির দেখা গেছে বলে জানান তিনি।

তবে বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের বিরুদ্ধে মাছ ধরার জাল কতটা কার্যকর হবে, তা এর নকশা ও স্থাপনের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে বলে সতর্ক করেন আদিল। পুলিশের দাবি করা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সুরক্ষার হিসাবেরও বাস্তব পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমেই সুরক্ষার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব।

খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের মুখপাত্র আব্দুল সালাম খালিদ অবশ্য জানান, কোহাট এলাকায় তাঁরা এই পদ্ধতির আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালিয়েছেন। পরীক্ষার সময় একটি জালের ওপর বিস্ফোরক ফেলা হলেও সেটি বিস্ফোরিত হয়নি।

হাঙ্গুর পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ খানও স্বীকার করেন, মাথার ওপর মাছ ধরার জাল টাঙিয়ে রাখা কোনো নিশ্চিত সমাধান নয়। তবে তাঁর ও সহকর্মীদের কাছে এটি কিছুটা নিরাপত্তা ও আশ্বাসের অনুভূতি দিচ্ছে। দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হলেও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এই ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

খান বলেন, এই জাল-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে না। তবু যেকোনো হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছেন এবং দেশ ও জনগণকে রক্ষা করতে প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করতেও পিছপা হবেন না।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102