রাজধানীর বারিধারায় প্রাইভেট কারের চাপায় নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আইনের সংস্পর্শে আনা কিশোরের জামিন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। রবিবার (৪ অক্টোবর) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন মামুন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ওই কিশোরের পক্ষে আজ জমিন আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিরোধিতা করি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন। এ দিন ওই কিশোরের পক্ষে আদালতে জামিন শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান।
আদালতকে তিনি বলেন, সেদিন ড্রাইভার কৌশলে বাম পাশ দিয়ে বের হয়। ওই শিশু নির্দোষ। আমরা জামিন চাই। বিচারককে তিনি বলেন, এই মামলায় আপনার জাজমেন্ট হচ্ছে তিন লাখ বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু আমরা এটা আগেই দিয়ে এসেছি ভুক্তভোগী পরিবারকে। বাদীপক্ষ আদালতে এসেছে। তাদের আপত্তি নেই।
এ সময় বেঞ্চে বসে থাকা নিহতের বাবা ও ভাই সামনে গিয়ে দাঁড়ান। ওই কিশোরের আইনজীবী বলেন, সে (অভিযুক্ত) একজন শিশু।
সে জামিনের হকদার।
এ সময় আদালত জিজ্ঞাসা করেন, হাজত খেটেছে কত দিন। উত্তরে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, আজ ১২ দিন হাজত খাটছে।
এ সময় আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার বক্তব্য কি? পিপি বলেন, এটা একটা চাঞ্চল্যকর মামলা। ওই কিশোরের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। তার গাড়ি চালানোর কোনো অনুমতি নেই। জামিনে আপত্তি আছে। বিচারক বলেন, শিশুর কি আর লাইসেন্স থাকে? এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, ড্রাইভিং সিটে ওই শিশু ছিল না।
বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীকে জিজ্ঞাসা করেন, এখন জামিন পেলে সমাজে কি মেসেজ যাবে? আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, আইন অনুযায়ী সে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের আপস হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়ে হাজতে আছে। তারপর আইন অনুযায়ী জামিন পেয়েছে—এটাই।
এ সময় উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে করে আদেশ দেন। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর একই আদালত ওই কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। সেদিন ওই কিশোরের পক্ষে আদালতে জামিনের আবেদন দাখিল করলে আদালত ২৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রাখেন। সেদিন আদালত আংশিক শুনানি শেষে আজ রবিবার উচ্চতর শুনানির দিন ধার্য রাখেন আদালত। ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে, বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে। গাড়িচাপায় নিহত হন মেহেদী হাসান (২৪) নামের নির্মাণশ্রমিক। তার বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামে। ঘটনার সময় ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী। দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার উঠে যায় সেই ফুটপাতে। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান মেহেদী।
এ ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা করেন নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদীর ইসলাম। মামলায় কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। গাড়িচালক হিসেবে আকাশ মারক (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তবে পুলিশ এখনো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেয় উপস্থিত লোকজন। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রথমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। ‘চালকের আসনে ছিল কিশোর, মামলায় আসামি আরেকজন’—এই শিরোনামে প্রথম আলো অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কিশোরের সম্পৃক্ততা পায়। পরে তাকে আইনের সংস্পর্শে আনা হয় বলে জানায় পুলিশ।
তাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত। এ ঘটনায় বাদীপক্ষের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপস হয় অভিযুক্ত ওই কিশোরের পরিবারের। গত ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে আংশিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ দিন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে আপসনামা দাখিল করেনি। তবে আদালতকে সেই নথি দেখান।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই কিশোর ঢাকার গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ বছর। তার বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন ক্যাপ্টেন। আর দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কারটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত।