সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৮ অপরাহ্ন

গাছে গাছে মুগ্ধর লেখা স্লোগান, ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে গাছের সারি। সেসব গাছের গায়ে সাঁটানো ছোট ছোট পোস্টার। তাতে লেখা ‘অকারণে গাছ কাটবো না’, ‘পাখি আমাদের বন্ধু’, ‘মোড়ে গতি কমান, জীবন বাঁচান‘, ‘মাদককে না বলুন’—এসব স্লোগান।

স্লোগানগুলোর মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার গুরুদায়িত্ব পালন করছে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। নাম মিছবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। নিজের হাতের লেখায় স্লোগান লিখে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে থাকা গাছে গাছে লাগিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে এই শিশু। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নজর কেড়েছে এলাকাবাসীর।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের শাহবাজার এলাকা। ওই এলাকার ঘোগারকুটি গ্রামের সুন্দর একটি পাকা সড়ক। সড়কের দুই পাশে গাছের সারি।

সেসব গাছে ঝুলছে সুন্দর হাতের লেখায় একেকটি পোস্টার। অবসর সময়ে গভীর মনোযোগ নিয়ে পোস্টার লিখছে মুগ্ধ। ছবি : কালের কণ্ঠ
সরেজমিন ঘোগারকুটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পথচারীদের অনেকে হঠাৎ চমক দাঁড়িয়ে পড়ছেন। পোস্টারের লেখা পড়ছেন আর মুগ্ধ হচ্ছেন। ঝকঝকে গোটা গোটা অক্ষরে এসব স্লোগান নিজের হাতে লিখেছে মুগ্ধ।

উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে শিশুটি।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরাবর ক্লাসে প্রথম হয় মুগ্ধ। এই বয়সেই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে চিন্তা করে এলাকার জন্য, দেশের জন্য ভালো কিছু করার। সময় পেলেই হাতে রং-তুলি আর কাগজ নিয়ে মেঝেতে বসে স্লোগান লিখতে থাকে। তার চোখে-মুখে গভীর মনোযোগ।

সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ে টিউটরিয়াল ক্লাস থেকেই ছবি আঁকা আর সুন্দর হাতের লেখার হাতেখড়ি তার। সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সে এখন বদলে দিতে চায় চারপাশের অসংগতির ছবি। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছে তারই সহপাঠী ও এলাকার শিশুরা। মুগ্ধ নিজের সাইকেলে চড়ে, কখনো হেঁটে হেঁটে বন্ধুদের নিয়ে সুতো দিয়ে গাছের গায়ে পোস্টার লাগায়। এ জন্য একটি মই তৈরি করেছে। মুগ্ধ পোস্টার লাগায়, আর বন্ধুরা মুগ্ধ চোখে মুগ্ধর কাজ দেখে।

পথচারী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় লেখাগুলো দেখে অবাক হয়েছি। এত ছোট্ট একটা ছেলে, এত সুন্দর চিন্তা করতে পারে- ভাবাই যায় না। ওর লেখাগুলো পড়ে মানুষ যদি সচেতন হয়, তাহলেই সার্থক হবে ছেলেটির ভাবনা।’

ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের ভাষায়, ‘আমরা জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ দেখে অভ্যস্ত। এগুলোকে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু আমাদের পাড়ার ছেলে মুগ্ধ এভাবে নীতিকথা লিখে গাছে গাছে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। এর মাধ্যমে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে ছেলেটি। আমরা মুগ্ধর জন্য অনেক আশীর্বাদ করি।’

গাছে পোস্টার সাঁটানোর পর সহযোগী শিশুদের নিয়ে ভি চিহ্ন দেখাচ্ছে মুগ্ধ। ছবি : কালের কণ্ঠ
ছেলের কাজ নিয়ে মুগ্ধর মা মমতা বেগমের ভাষ্য, ‘আমার ছেলে ঘরে থাকা কার্টন কেটে, খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সেখানে বিভিন্ন স্লোগান লিখে জমা করত। এরপর পাড়ার বন্ধুরা মিলে একটা মই তৈরি করে, আমার কাছ থেকে আঠা আর সুতো নিয়ে বাইরে যায়। পরে পাড়ার লোকজন এসে বলতে লাগল—‘তোমার ছেলে গ্রামজুড়ে গাছে পোস্টার লাগিয়ে বেড়াচ্ছে’।

মমতা বেগম বলেন, ‘কথাগুলো শুনে আমরা বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। চোখ দুটো ভিজে যায়। ছেলে যে এ ধরনের পরিকল্পনা করেছে, আমার জানা ছিল না। ওর জন্য সবাই দোয়া করবেন। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য যেন সব সময় ভালো কিছু করে।

শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও মুগ্ধর বাবা সুজাউদ্দৌলা বলেন, ‘স্কুল ছুটি শেষে বাসায় ফিরছিলাম; সবাই বলাবলি করছে মুগ্ধ গাছে গাছে কী যেন লাগাচ্ছে। আমি সড়কের দুই পাশে তাকিয়ে দেখি, আমার ছেলের হাতের লেখা পোস্টার! সুন্দর সুন্দর নীতিবাক্য লিখে ছড়িয়ে দিয়েছে। গোপনে এসব কাজ করছিল সে। আমাকে জানায়নি।’

আবেগাপ্লুত বাবা এরপর বলেন, ‘আমি সত্যি অবাক হয়েছি। এত ইমোশনাল হয়ে গেছি যে, বাসায় এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। আপনারা দোয়া করবেন ছেলে যত দিন এ ধরনের কাজ করবে, তত দিন আমি তাকে বন্ধুর মতো সহযোগিতা করব।’

জানা গেছে, মুগ্ধ উদ্বুদ্ধ হয়েছে উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলীর কাছে। সোবেদ আলী বলেন, ‘টিউটরিয়াল ক্লাসে ছবি আঁকা, পোস্টার-প্ল্যাকার্ড ও হাতের লেখা শেখানো হতো।’ তিনি বলেন, মুগ্ধর হাতের লেখা ভালো। সে খুবই মনোযোগী ছাত্র। সব সময় নতুন কিছু করতে চাইত। সেই চাওয়া থেকে হয়তো এমন ভালো কাজ করতে পেরেছে সে।’

প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘এভাবে সব শিক্ষার্থী সামাজিক জনসচেতনামূলক কাজে এগিয়ে এলে সমাজে ইতিবাচক একটা পরিবর্তন হবে।’

কথা হয় মুগ্ধর সঙ্গে। দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। বাবা স্কুল শিক্ষক। মা গৃহিণী। পারিবারিকভাবে সে শিক্ষামূলক কাজে আগ্রহী ছিল। মা তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করতেন বলে মুগ্ধ জানায়।

মুগ্ধর ভাষ্য, ‘আমি ক্লাসে পোস্টার-প্ল্যাকার্ড লেখা শিখে ২০টির মতো বাণী লিখে গোপনে জমা করি। গ্রামের মানুষকে নিয়ে চিন্তা করি। এলাকার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন নয়, তারা অকারণে গাছ কেটে ফেলছে, বাড়ির চারপাশ নোংরা করছে; অনেকে মাদকে আসক্ত।’

মুগ্ধ বলে, ‘এসব মানুষকে সচেতন করার জন্য পোস্টার লিখে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তার দুই পাশে লাগিয়ে দিই, যাতে তারা মনে করে, অনেক কাজ আছে যেগুলো তারা না করলেও পারে। এভাবেই প্রতিবাদ ও মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ হাতে নেই আমি।’ সে বলে, ‘আমার এই ছোট্ট কাজে একজন মানুষ সচেতন হলেও, সেটাই আমার সফলতা। এই কাজ আমি চালিয়ে যাব।’

ফুলবাড়ী উপজেলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বড়ভিটা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও সংস্কৃতিকল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক মো. নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘সমাজে সৃজনশীল ও সচেতনতামূলক কাজে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষর্থীদের খুব একটা দেখা যায় না। এই ধরনের প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক শিশুরাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

google newsকালের কণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102