সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ন

দুই বছরে কুকুর-বিড়ালের আক্রমণ বেড়েছে ৫৫%

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সারাদেশে কত মানুষ কুকুর-বিড়ালের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, সে তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বাড়া এবং পোষা বিড়াল পালনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। এতে জলাতঙ্কের সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ছে।

এমন বাস্তবতায় আজ (সোমবার) পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। প্রতিবছর দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘একসঙ্গে আমরা আরও শক্তিশালী’। এ দিন জলাতঙ্ক নির্মূল ও রোগটি প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর জলাতঙ্কে আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ মারা যান। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশই কুকুরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে নিয়মিত টিকা দেওয়া গেলে সংক্রমণের চক্র ভাঙা সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। তাই আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত টিকা নেওয়াই এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন। ২০২৪ সালেও এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩। আর চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭ হাজারে।

দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। ২০২৪ সালে এ রোগে মারা যান ৫৮ জন। ২০২৫ সালে ৫৯ জন। চলতি বছরের প্রথম আড়াই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৩৫ জনের।

দেশে জলাতঙ্কের চিকিৎসা দেওয়া হয় দুটি হাসপাতালে। তবে এসব হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তর মূলত রোগ প্রতিরোধে টিকা দেওয়ার কাজ করে। মাঠ পর্যায়ের কিছু কেন্দ্রেও টিকার সংকট রয়েছে।

গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর থেকে মহাখালীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসেছেন মা রেহেনা আক্তার। তাঁর দেড় বছরের শিশু রাইয়ান ইনজেকশনের যন্ত্রণায় হাসপাতালের বারান্দায় বসেই কান্না করছিল। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাড়িতে পোষা বিড়াল তার ডান হাতে কামড় দেয়। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুরু হয়েছে জলাতঙ্কের টিকা।

একই হাসপাতালে টিকা নিতে এসেছিলেন মোহাম্মাদপুরের চাঁদ উদ্যানের শারমিনা আক্তার খাদিজা। তিনি জানান, কয়েক দিন আগে বাসার পাশে একটি বিড়াল বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চাগুলোকে খাওয়ানোর সময় আকস্মিকভাবে বিড়ালটি তাঁর বাম হাতে কামড় দেয়।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা এক নার্স বলেন, এখন আসা রোগীদের বড় অংশই পোষা বিড়ালের আক্রমণের শিকার। অনেকেই পোষা বিড়ালকে টিকা দেন না। গত তিন-চার বছরে বিড়ালের আক্রমণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

অচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা

জলাতঙ্ক নির্মূলে ২০১০ সাল থেকে দেশে সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। এর আওতায় কুকুরকে টিকা দেওয়া, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। ৬৪ জেলার সবকটিতে প্রথম দফার টিকাদান শেষ হয়। দ্বিতীয় দফায় টিকা দেওয়া হয় ৪৬ জেলায়। তৃতীয় দফা হয় আট জেলায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর কর্মসূচি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে নতুন করে কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

দরপত্র ছাড়াই ৯ লাখ জোড়া টিকা

স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অপারেশন প্ল্যান (ওপি) ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এর পর জলাতঙ্কের টিকার সংকট দেখা দেয়। আগে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে এ টিকা দেওয়া হতো। ওপি বন্ধ হওয়ার পর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় টিকার সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত এপ্রিল ৯ লাখ জোড়া টিকা দরপত্র ছাড়াই ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেডের কাছ থেকে কেনা হয়। বর্তমানে সরকারের হাতে প্রায় ৫৯ হাজার ডোজ টিকা মজুত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনা হলে কম দামে কেনার সুযোগ ছিল। তবে দ্রুত সংকট কাটাতে দরপত্র ছাড়াই টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফএ আসমা খান। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে টিকার সংকট মেটাতে ইনসেপ্‌টা থেকে টিকা কেনা হয়। পরে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে ওই দরপত্রে এমন শর্ত দেওয়া হয়, যাতে ইনসেপ্‌টা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে না পারে। রেনাটাও জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ করে।

দেরি করলেই বাড়ে ঝুঁকি

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ের পর দ্রুত টিকা নিতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে অনেকেই দেরি করে হাসপাতালে আসেন। কেউ কেউ প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন, পরে হাসপাতালে আসেন। এতে ঝুঁকি বাড়ে।

সিডিসির সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ডোজ র‍্যাবিস ভ্যাকসিন এবং ৩ লাখ ডোজ র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন সরবরাহের কার্যক্রম রয়েছে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে ওই পরিকল্পনায় মানুষের টিকাদানের বিষয়টিই রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কুকুরকে টিকা দেওয়া বা কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102