দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক বাক্প্রতিবন্ধী নারীকে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করিয়েছিলেন পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন। পরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে না রেখে হাসপাতালের ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে কুকুর-বিড়ালের কাছে ফেলে যায় কে বা কারা।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে কুকুর বিড়ালের সঙ্গে ভাগাড়ে পড়ে থাকা ওই নারীর কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাত ৯টার দিকে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ফের হাসপাতালে ভর্তি করায়।
শুক্রবার রাতে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরের দক্ষিণ পাশে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এর আগে গত বুধবার রাত ১টার দিকে দেবিদ্বার পৌর এলাকার ভিংলাবাড়ি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় ওই নারী। খবর পেয়ে দেবিদ্বার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অজয় চক্রবর্তীসহ স্থানীয় লোকজন দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের ভাষ্য, কয়েকদিন আগে সড়কে একটি সিএনজি অটোরিকশার সঙ্গে ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হয় বাকপ্রতিবন্ধী ওই নারী। দুর্ঘটনার পর পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে উদ্ধার করে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। পরে সেখানে ভর্তির পর সামান্য চিকিৎসা দিয়ে পরে তাকে কমপ্লেক্সের ভেতরে ময়লা ফেলার স্তুপে ফেলে যায়। ভাগাড়ে গত তিন দিন ধরে তাকে কুকুর বিড়াল কামড়াচ্ছিলো, কিন্তু কেউ তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের ভেতরে নেয়নি।
ওই নারীকে উদ্ধারকারী স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিয়াম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন দিন আগে দুর্ঘটনায় আহত ওই নারীকে থানা পুলিশের কয়েকজন সদস্য দেবিদ্বার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করায়। এরপর তাকে চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে হাসপাতালের ময়লার ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের বারান্দাতেও তার ঠাঁই হয়নি। তাকে তিন দিন কুকুর-বিড়াল, পোকা মাকড়ের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছে। এটা কতটা নির্মম ঘটনা, তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না।
এখন আমরা তাকে উদ্ধার করে আবার হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। ‘ওই নারী বোবা, প্রতিবন্ধী, তিনি কথা বলতে পারেন না, তার সঙ্গে কেউ নেই। এই সুযোগেই তার সঙ্গে এমন নির্দয় আচরণ করা হয়েছে। আমরা হাসপাতালের আরএমও ডা. মো. কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি তিনি বলেন, বেওয়ারিশ রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব নাকি তাদের না। পরে আমরা কয়েকজন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসককে অনুরোধ করে তাকে আবার ভর্তি করিয়েছি।
বদিউল আলম নামে এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে জানান, হাসপাতালের ময়লা-আবর্জনায় কুকুর বিড়াল ও পোকা মাকড়ের ওপর ওই নারীকে অনেকটা অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগীর চিকিৎসা হয়, এই নারীরও চিকিৎসা করা যেত, কিন্তু হাসপাতালের কেউ এগিয়ে আসেননি। দুর্ঘটনায় তার কোমড়ে ভেঙে গেছে। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। তিন দিন ধরে কুকুর বিড়ালের সঙ্গে ময়লার ভাগাড়ে পড়েছিলেন ওই নারী।
এ বিষয়ে জানতে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মহিবুস ছালাম খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. কবির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বেওয়ারিশদের চিকিৎসার দায়িত্ব হাসপাতালের নয়, তবে কেউ যদি দায়িত্ব নিয়ে ভর্তি করায় তাহলে চিকিৎসা করা যাবে। ওই নারীকে তো ভর্তি করায়নি। তাই তার চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে জানান, বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে দুর্ঘটনায় আহত ওই নারীকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রেখে আসে। পরে শুক্রবার রাতে শুনতেছি ওই নারী হাসপাতালের ময়লার ভাগাড়ে পড়ে আছে বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, এই ঘটনা শোনার পর উপজেলা সমাজসেবা অফিসারকে খোঁজ-খবর নিতে বলা হয়েছে এবং তার প্রয়োজনীয় সকল চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ বহন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।