মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন

যুদ্ধ ভুলে বিনিয়োগের আহ্বান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক চায় আফগানিস্তান

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আফগানিস্তানের তালেবান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে নতুন করে প্রস্তাব দিয়েছে। তারা দেশটির খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে বলে জানিয়েছে।

তালেবানের অন্তর্বর্তীকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।
মুত্তাকি বলেন, ‘আফগানিস্তান এসব খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে অবশ্যই স্বাগত জানাবে।আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক গত ২০ বছরের যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তিতে দেখা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক নীতি উন্মুক্ত।

 তবে তার এই প্রস্তাব সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
আফগানিস্তানে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের আগের সরকারের করা ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে তামা, লোহা, কোবাল্ট, সোনা ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে।

এ ছাড়া আফগানিস্তানে সোনা, রুপা ও প্ল্যাটিনামের পাশাপাশি লৌহ আকরিক, ইউরেনিয়াম, জিঙ্ক, ট্যান্টালাম, বক্সাইট, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিপুল পরিমাণ তামার মজুত রয়েছে। বিশেষ করে তামা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বজুড়ে নতুন বড় তামার খনি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির খনিজ সম্পদের বড় অংশ এখনো উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে চীন ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের খনিজ বিনিয়োগ চুক্তি করেছে বলে দাবি করেছে তালেবান। এসব চুক্তির মধ্যে সোনা, রত্নপাথর এবং ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহৃত ক্রোমাইট উত্তোলনের প্রকল্প রয়েছে।

চীন, পাকিস্তান, ভারত ও ইরানসহ কয়েকটি দেশও আফগানিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর বিনিময়ে তারা আফগানিস্তানের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছে। তালেবান একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে থাকা আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ছাড়ের চেষ্টা করছে। দেশটির প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বিদেশে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে ছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় বাধা রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, কাজ এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর তালেবানের কঠোর বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেয়। তখন তারা ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর সময়ের তুলনায় আরও নমনীয় ও উদারভাবে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তালেবানের আগের শাসনামলে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়া এবং বামিয়ানে ঐতিহাসিক বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটেছিল।

তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ২০২১ সালের পর তালেবানের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি দ্রুতই ভেস্তে যায়। ক্ষমতায় ফেরার পর তারা নারী ও মেয়েদের ওপর একের পর এক কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে মেয়েরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়েছে এবং নারীদের চাকরি ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগও ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে।

জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, আফগান নারীদের বড় একটি অংশ এখন খুব কমই ঘরের বাইরে বের হন। সংস্থাটি বলছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির একটি পুরো প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তালেবান অবশ্য দাবি করে, তারা ইসলামি শরিয়া আইন অনুযায়ী নারীদের অধিকারকে সম্মান করে।

ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পরও তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে অস্বীকৃত। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাশিয়াই একমাত্র দেশ, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে আফগানিস্তানের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো তালেবান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেনি। বরং ট্রাম্প আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার কথা বলেছেন। তালেবান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

হোয়াইট হাউস এখনো মুত্তাকির সর্বশেষ বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের প্রতি আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। ২০১৭ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুদ্ধ ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১১৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। ট্রাম্প আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে এই ব্যয়ের একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।

এদিকে আফগানিস্তানে থাকা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন মুত্তাকি। তিনি বলেন, ‘বাগরামসহ আফগানিস্তানের সব সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা দেশটির জাতীয় সম্পদ।’ তাই এসব স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি জানান।

তবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে কাবুলে তাদের দূতাবাস আবার খুলতে পারে বলে জানিয়েছেন মুত্তাকি। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়।

মুত্তাকি আরো বলেন, ‘তালেবান কর্মকর্তারা দূতাবাস এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, সড়ক পুনর্নির্মাণ করেছেন এবং নতুন গাছ লাগিয়েছেন। ওই এলাকা খুব প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102