খোঁজ নেওয়ার জন্য বোন ও বোনের স্বামী-সন্তানদের ফোনে ফোন করেন পূজা চক্রবর্তী। কারোর ফোনেই কল যাচ্ছিল না।
এরপরই সন্দেহ হয়। পরে নিজের স্বামী অফিস থেকে ফিরলে তাকে নিয়ে বোনের বাড়িতে এসে দেখেন, তাদের বাসার কলিং বেল বাজছে না। পুরো বাড়ি অন্ধকার। ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া মিলছে না।
বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ এসে একে একে চারটি মরদেহ উদ্ধার করে।
গতকাল শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ সময় কান্না জড়িতকণ্ঠে পূজা চক্রবর্তী বলেন, আমার স্বামী অফিস থেকে আসার পর বললাম, দিদিদের ৪টা ফোনই বন্ধ কেন? চলো তো যাই ওদের বাসায়।
আমরা আসলাম, কলিং বেলও বাজে না। দেখলাম, পুরো বাড়ি অন্ধকার। দিদি, দিদি, আগামী (প্রার্থী), প্রিয়ম করে চিল্লাতে চিল্লাতে প্রতিবেশীদের কয়েকজন চলে আসলেন। তখন এক প্রতিবেশী বললেন, আজকে দুপুরের দিকে কী জানি অর্ডার করছিলেন, পার্সেল আসছিল। তখন কলিং বেল চাপছে কেউ খোলে না, লোকটা ঘুরে গেছে।
পরে পাশের একটা বাসায় গেলাম। তখন দুই বাড়ির মাঝের ছোট্ট একটা প্রাচীর টপকিয়ে উঠলাম। জোরে জোরে জানালার থাই গ্লাসে ধাক্কা দেওয়ার পর সেটা খুলে গেছে। মোবাইলের আলো দিয়ে দেখি, ওদের ওয়্যারড্রবের ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ যা যা ছিল সব ছড়ানো-ছিটানো। তখন আমি চিৎকার করলাম।’
পূর্জা চক্রবর্তী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ভাগ্নি আগামী ফোন দিছিল, রাত ১টা-দেড়টার দিকে। এমনি কুশল বিনিময়। শনিবার আবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ফোন দিছি। আমার দিদির ফোনেও ফোন ঢোকে না, দুঃখিত বলে। জামাইবাবুর ফোনেও ফোন ঢোকে না। ভাগ্নির ফোনেও ফোন ঢোকে না। আর প্রিয়ম যে ক্লাস ফাইভে পড়ে ওর একটা বাটন ফোন আছে, সেটাতেও ফোন ঢোকে না।’
পূজা চক্রবর্তী আরো বলেন, পরে তাদের বাড়িতে এসে দেখি আমার ভাগ্নের লাশ খাটের নিচে। আমার বড় বোনকে সিঁড়িতে ফেলে রাখছে। আমার বড় বোনের ওপর ভাগ্নিকে ফেলে রাখছে।’
ঘটনার বিচার দাবি করে পূজা বলেন, ‘উনি জিলা স্কুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করছেন। খুব শান্ত মানুষ। তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেলল। আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী! আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ি কাজ এখনো শেষ হয়নি। সেই বাড়ির দোতলায় সম্প্রতি পরিবার নিয়ে থাকা শুরু করেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়ির নীচতলাটা ফাঁকাই। তারা নতুন এসেছেন বলে এখনো প্রতিবেশীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠেনি।
স্থানীয়রা জানান, শনিবার রাতে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী এসে ডাকাডাকি করেন। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফটক বন্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করেন।
রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলছেন, ‘তাদের খুন করা হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো রয়েছে। তাদের পুরো ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এটা ডাকাতি হতে পারে।