মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে থাকায় প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সামরিক সদস্যের জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, নষ্ট প্লাম্বিং, লন্ড্রি সুবিধার সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও মানসিক চাপের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাব চেয়েছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা।
মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরীটির কয়েকজন সদস্য সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার কথা বিবেচনা করেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এ নিয়ে জাহাজে থাকা সামরিক সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন।
রণতরীটি গত বছরের নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করে। পরে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। মে মাসে এর মোতায়েন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত রণতরীটির ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রণতরীটির পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে দেওয়া এক চিঠিতে রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, পানিদূষণ, প্লাম্বিং সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা এবং ডাকব্যবস্থায় বিঘ্ন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের বরাতে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যান। পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করে জাহাজের চিকিৎসা বিভাগে নেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
জাহাজে থাকা এক নাবিকের আত্নীয় বিবিসিকে জানান, দায়িত্ব শুরুর পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা প্রায় ২৯ কেজি ওজন হারিয়েছেন। দীর্ঘ সময় বন্দরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগের অভাব এবং বিমান ওঠানামা ও ইঞ্জিনের অবিরাম শব্দ ও কম্পনের কারণে নাবিকদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইক লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, জাহাজে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ ধরে লন্ড্রি বন্ধ থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানি না থাকা এবং খাবারের সংকট রয়েছে। এমনকি সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত সরবরাহকেন্দ্রগুলোতে বিঘ্ন ঘটেছে। বর্তমানে জাহাজে মিশন-গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজে বিশুদ্ধ পানি, কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথও বলেন, প্রতিটি জাহাজ, নাবিক ও কমান্ডারকে প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কঠিন পরিস্থিতিতে নাবিকদের ভূমিকার প্রশংসাও করেন তিনি।
এদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে গুরুতর মানসিক চাপের হার বেশি। গবেষণায় জাহাজের জীবনযাপনের পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগের ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।