ইয়াবাসহ আটকের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তি: ‘মোফা বাবু’কে ঘিরে নতুন বিতর্ক
রাজধানীর খিলক্ষেত ও নিকুঞ্জ এলাকায় মাদক ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ইসমাইল হোসেন বাবু ওরফে মোফা বাবুকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। কিন্তু তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি করা এই অভিযানের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই এক লাখ টাকার বিনিময়ে রহস্যজনকভাবে মুক্তি পেয়েছেন খিলক্ষেত থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের ৯৬ নম্বর ওয়ার্ডের এই কথিত সদস্য সচিব। খোদ ডিবি পুলিশের মতো একটি বিশেষায়িত ইউনিটের এমন প্রকাশ্য ‘টাকা-বাণিজ্য’ এবং এর পেছনে খিলক্ষেত থানা বিএনপির এক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক আশকারা নিয়ে পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে একটি জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনী গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে একজন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে এভাবে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনের নৈতিকতাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, সোমবার রাত আটটার দিকে নিকুঞ্জ-২ এলাকার একটি রেস্তোরাঁর সামনে মাদক বিক্রির সময় মোফা বাবুকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল। অত্যন্ত গোপনীয়তা ও দক্ষতার সাথে এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হলেও পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের ভূমিকা চরম বিতর্কের জন্ম দেয়। এর আগেও সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার হাতে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কমপক্ষে হাফ ডজনবার গ্রেপ্তার হয়েছিল এই মোফা বাবু। কিন্তু প্রতিবারই নিকুঞ্জে বসবাসরত খিলক্ষেত থানা বিএনপির ওই শীর্ষ নেতার শক্তিশালী রাজনৈতিক তদবির ও লেজুড়বৃত্তির জোরে সে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। তবে এবারের গ্রেপ্তারের পর যে নাটকীয়তা ঘটেছে, তা পূর্বের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে এবং খোদ ডিবি পুলিশের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনৈতিক রূপটি উন্মোচিত করে দিয়েছে।
ডিবি হেফাজত থেকে মুক্ত হয়ে মোফা বাবু নিজেই তার ঘনিষ্ঠ মহলে দম্ভোক্তি করে এই মুক্তির বিষয়ে মুখ খুলেছেন। নিজের এক চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিতে সে সরাসরি বলেছে যে, ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং মাদকসহ আটকের পর তারা প্রথমে তার বাবার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ দরদাম ও দরকষাকষির পর অবশেষে মাত্র ১ লাখ টাকার বিনিময়ে ডিবি পুলিশ তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। ঘুষের টাকা পরিশোধের পরপরই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে সে জানায়। শুধু তাই নয়, মুক্ত হয়ে এই কথিত নেতা আফসোস করে ঘনিষ্ঠদের কাছে মন্তব্য করেছে যে, ‘আগের আমলেই ভালো ছিলাম, এই আমলে বিপদ যেন আমার পিছুই ছাড়ছে না।’ একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর মুখ থেকে এমন বক্তব্য এবং টাকার বিনিময়ে ডিবি পুলিশের ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি এখন পুরো খিলক্ষেত ও নিকুঞ্জ এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
টাকার বিনিময়ে নাটকীয়ভাবে ছাড়া পাওয়ার পর মোফা বাবুর আচরণে কোনো অনুশোচনা তো দেখাই যায়নি, উল্টো সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু করেছে আরেক নতুন তামাশা। কারাগার থেকে বের হয়েই সে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে বিভিন্ন ধরনের উল্টাপাল্টা, আবেগঘন এবং একই সাথে রাগান্বিত পোস্ট দেওয়া শুরু করেছে। নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং নিজেকে ‘নির্দোষ’ বা ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার’ প্রমাণ করার চেষ্টায় তার দেওয়া এসব বিভ্রান্তিকর পোস্ট দেখে স্থানীয় মানুষের মাঝে তীব্র হাস্যরস ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী বলছেন, মাদকসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের হাত করে বের হয়ে এসে ফেসবুকে এমন রাগান্বিত ও বুক ফুলিয়ে পোস্ট দেওয়া প্রমাণ করে যে, সে আইন ও সমাজকে কতটা বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খিলক্ষেত থানার ৯৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব পদের এই কথিত নেতার বিরুদ্ধে অপরাধের খতিয়ান দীর্ঘ হলেও প্রতিবারই সে আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়ায়। স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মোফা বাবুর এই লাগামহীন বেপরোয়া আচরণের মূল খুঁটির জোর নিকুঞ্জে বসবাসরত খিলক্ষেত থানা বিএনপির এক প্রভাবশালী যুগ্ম আহ্বায়ক। নিকুঞ্জ এলাকায় সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী—প্রত্যেকই এই গোপন বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। ওই এলাকায় বসবাসরত এই শীর্ষ নেতার সরাসরি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণে মোফা বাবু নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার ধৃষ্টতা দেখাত। এই গডফাদারের প্রত্যক্ষ আশকারাতেই সে এলাকায় একচ্ছত্র অপরাধের ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে সক্ষম হয়েছে।
বরাবর-ই মোফা বাবু গ্রেপ্তার হওয়ার পর এলাকায় সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও সে জামিনে কিংবা তদবিরের জোরে বের হয়েই আরও হিংস্র ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই গডফাদারের অভয়শরণে সে পুনরায় শুরু করে এলাকায় বিষাক্ত ইয়াবা ও মাদকের কারবার। একই সাথে ফুটপাত ও দোকানপাট থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করে সে ত্রাসের রাজত্ব বজায় রাখত। তার এই লাগামহীন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটের কারণে পুরো নিকুঞ্জ এলাকার সামাজিক পরিবেশ সম্পূর্ণ বিষাক্ত এবং সাধারণ মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। বারবার অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার এই সংস্কৃতি কথিত এই নেতাকে এলাকায় এক প্রকার অস্পৃশ্য করে তুলেছে। যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে সে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক বনে গেছে, অথচ প্রশাসন সব জেনেও যেন এক অদৃশ্য কারণে তার ওই প্রভাবশালী খুঁটির জোরের কাছে একপ্রকার অসহায় ভূমিকা পালন করছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অন্তত ছয়বার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও দল তার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাকে দল থেকে বহিষ্কার তো দূরের কথা, সাধারণ একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ বা তিরস্কার পর্যন্ত করার সাহস দেখায়নি স্থানীয় নেতৃত্ব। মূলত নিকুঞ্জে বসবাসরত খিলক্ষেত থানা বিএনপির ওই যুগ্ম আহ্বয়কের অনৈতিক হস্তক্ষেপ, পকেট কমিটি গঠন ও অপরাধী পোষার নীতির কারণেই বাবুর মতো চিহ্নিত অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে দলের ত্যাগী ও আদর্শবান নেতাকর্মীরা তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দুয়েকজন বিতর্কিত নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সুনাম আজ চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
বিএনপির দলীয় প্রধান যেখানে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক ব্যবসাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি নিয়ে এগোচ্ছেন, সেখানে মোফা বাবুর মতো চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিকে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে রাখা এবং থানা কমিটির শীর্ষ নেতার তাকে নিয়মিত সমর্থন করা দলের মূল আদর্শ ও নীতিকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে দলের নীতি ও আদর্শ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের পাশাপাশি জনমনে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন, শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও তৃণমূলের বা থানার কিছু নেতা কীভাবে এত বড় অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার সাহস পান।
সচেতন মহল ও তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মীরা মনে করছেন, রাজনীতিকে জনগণের কল্যাণে ব্রতী করতে হলে অনতিবিলম্বে এই ধরনের গডফাদার ও সুযোগসন্ধানী সমাজবিরোধী উপাদানের কবল থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে। একই সাথে, সরকারের বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। মোফা বাবুকে আটকের স্থান খিলক্ষেতের ওই নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁ কিংবা সংলগ্ন হোটেলের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চেক করলেই সোমবার রাত ঠিক আটটার অভিযানের সত্যতা বেরিয়ে আসবে। সেই ফুটেজ পরীক্ষা করলে স্পষ্ট জানা যাবে যে, অভিযানে এসে মোফা বাবুকে ইয়াবাসহ আটক করার পরও ডিবি পুলিশের কোন কোন কর্মকর্তা জড়িত থেকে শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে এই জঘন্য অপরাধে সহায়তা করেছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে দেশের মানুষ কোনো স্বার্থবাদী, ঘুষখোর কিংবা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা নেতাকে দেখতে চায় না। সচেতন মহলের দাবি, আইনের ফাঁকফোকর গলে এই কুখ্যাত অপরাধী এবং তার পেছনে থাকা নেপথ্য মদদদাতা রাজনৈতিক নেতা ও ডিবি পুলিশের অসাধু কর্মকর্তা—কারো যেন আর পার পেয়ে সমাজের শান্তি বিনষ্ট করার সুযোগ না থাকে। সেজন্য প্রশাসনের কঠোর, আপসহীন ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, এই এক মোফা বাবুর অপরাধ, মাদক বাণিজ্য, অনলাইন দম্ভ এবং দুর্নীতির দায় পুরো দল এবং খিলক্ষেত এলাকার সাধারণ নিরীহ মানুষকেই আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।