রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ পরিবর্তিত বাস্তবতায় আমাদের তরুণদেরকে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয় বরং প্রযুক্তির উদ্ভাবক ও নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দুর্গাপুরে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালিত বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে সময়মতো ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করার তাগিদ দিলেন ভূমি মন্ত্রী ৬৪ জেলা ও ৭৪টি প্রত্যন্ত উপজেলায় ৩ দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজনে শুরু হচ্ছে ‘নজরুল বর্ষ’ ভেনেজুয়েলার কুখ্যাত গ্যাং নেতা নিহত, দাবি ট্রাম্পের সরকারী কর্মচারীদের কোনো দলের জন্য নয়, বরং দেশের স্বার্থে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহবান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইংল্যান্ড দলের চুরি হওয়া সরঞ্জাম উদ্ধার, দুই ব্যক্তি গ্রেপ্তার বারবার আত্মসমর্পণের আবেদন করে প্রত্যাহার রেস্টুরেন্ট মালিকের

রোনালদোর ফেরা এক বিস্ময়ের বিশ্বকাপ

অনলাইন ডেক্স রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

২০০২ সালের ৩০ জুন। জাপানের ইয়োকোহামা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের আকাশে তখন গ্রীষ্মের আলো। গ্যালারিতে হাজারো মানুষের কণ্ঠ একসঙ্গে গর্জে উঠছে। সবুজ ঘাসের ওপর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাশক্তি ব্রাজিল ও জার্মানি।

এক পাশে অলিভার কান, যিনি পুরো টুর্নামেন্টে প্রায় একাই জার্মানির দুর্গ হয়ে উঠেছিলেন। অন্য পাশে রোনালদো, যার হাঁটু একসময় ডাক্তারদের সন্দেহে ভরে দিয়েছিল, যার ক্যারিয়ারকে অনেকেই শেষ বলে ধরে নিয়েছিল। সেদিন শুধু ট্রফির নয় লড়াই ছিল ফেরার। বিশ্বাসের সাথে লড়াই ছিল ভাগ্যের বিরুদ্ধে মানুষের জয়ের।

২০০২ সালের বিশ্বকাপের গল্প শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে। সিদ্ধান্তটি ঘোষণার পর বিস্মিত হয়েছিল ফুটবল বিশ্ব। এতদিন বিশ্বকাপ ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার উৎসব। এবার সেই মহাযজ্ঞ পাড়ি জমাল এশিয়ার মাটিতে। অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন। এশিয়া কি পারবে? ফুটবল সংস্কৃতি কি যথেষ্ট শক্তিশালী? দর্শক আসবে তো? কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই দুই দেশ বুঝিয়ে দিয়েছিল, তারা শুধু আয়োজক নয়, ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের নির্মাতা। নতুন স্টেডিয়াম তৈরি হলো। রেল যোগাযোগ আধুনিক করা হলো। প্রযুক্তি ও শৃঙ্খলার এক অনন্য সমন্বয় দেখা গেল। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এশিয়া বুঝিয়ে দিয়েছিল ফুটবল আর শুধু পশ্চিমের সম্পদ নয়। এটি এখন পুরো বিশ্বের।

সেই সময়ের পৃথিবীও ছিল অস্থির। মাত্র কয়েক মাস আগে ঘটে গেছে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা। বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি নতুন মোড়ে। এই বাস্তবতার মধ্যেই শুরু হয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব। ৩২টি দেশ এসেছিল স্বপ্ন নিয়ে। কেউ এসেছিল গৌরব রক্ষার জন্য। কেউ এসেছিল পৃথিবীকে চমকে দিতে। কেউ এসেছিল শুধু নিজেদের পতাকাটিকে বিশ্বের সামনে উড়িয়ে দিতে।

ফ্রান্স এসেছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। জিনেদিন জিদান তখন বিশ্বের সেরা ফুটবলার। চার বছর আগে যে দল বিশ্ব জয় করেছিল, তাদের নিয়েই আবারও শিরোপার স্বপ্ন।

আর্জেন্টিনা এসেছিল অন্যতম ফেভারিট হিসেবে। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হার্নান ক্রেসপো, হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন—তারকায় ভরা দল। ইতালি এসেছিল ফ্রান্সেসকো তত্তি, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরিদের নিয়ে। পর্তুগালের ছিল লুইস ফিগো। স্পেনের ছিল রাউল। ইংল্যান্ডের ছিল ডেভিড বেকহ্যাম।

আর ব্রাজিল? ব্রাজিল এসেছিল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে। বাছাইপর্বে তারা ছিল নড়বড়ে। কোচ বদলেছে। সমালোচনা বেড়েছে। কিন্তু তাদের সামনে ছিল এক ভয়ংকর ত্রয়ী রোনালদো, রিভালদো এবং রোনালদিনিও। যাদের পরে পুরো পৃথিবী ডাকতে শুরু করেছিল’থ্রি আর’।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর প্রথম বড় ধাক্কা আসে উদ্বোধনী ম্যাচেই। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স সেনেগালের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। আফ্রিকার নবাগত দলটি যেন পুরো পৃথিবীকে চমকে দিল। সেনেগালের খেলোয়াড়দের চোখে ছিল ভয়হীনতা। তারা নামের বিরুদ্ধে খেলছিল না। তারা খেলছিল সমানে সমানে। সেই ম্যাচের পর বিশ্ব বুঝে গেল বড় দলগুলোর জন্য কোনো নিরাপদ রাস্তা নেই। এরপর শুরু হলো অঘটনের মিছিল। ফ্রান্স পুরো গ্রুপপর্বে একটি গোলও করতে পারল না। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল বিদায় নিল প্রথম রাউন্ড থেকেই। বিশ্ব হতবাক।

এরপর বিদায় নিল আর্জেন্টিনা। যে দলকে অনেকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার মনে করেছিল, তারা গ্রুপপর্ব পেরোতেই পারল না। সুইডেন, ইংল্যান্ড ও নাইজেরিয়ার কঠিন গ্রুপে আটকে গেল তাদের স্বপ্ন। বাতিস্তুতার চোখে তখন হতাশা। একটি যুগ যেন শেষ হয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে ব্রাজিল শুরু থেকেই ছন্দে। তুরস্কের বিরুদ্ধে রিভালদোর নাটকীয়তা বিতর্ক তৈরি করলেও জয় পেল সেলেসাওরা। চীনের বিরুদ্ধে সহজ জয়। কোস্টারিকার বিরুদ্ধে গোল উৎসব। তিন ম্যাচেই জয়। নয় পয়েন্ট।

ব্রাজিল এগিয়ে চলেছে। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া লিখছিল নিজেদের ইতিহাস। গাস হিডিঙ্কের অধীনে দলটি বদলে গিয়েছিল। অসাধারণ ফিটনেস। অসীম পরিশ্রম। অদম্য বিশ্বাস। দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড়রা যেন দৌড়াতেন থামাহীন। দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল উন্মাদনা। লাল পোশাকে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসছিল। ‘রেড ডেভিলস’হয়ে উঠেছিল জাতীয় আন্দোলনের নাম। জাপানও প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠল। এশিয়ার ফুটবল নতুন পরিচয় পেল। নকআউট পর্ব শুরু হতেই নাটক আরও গভীর হয়ে উঠল। ব্রাজিলের সামনে বেলজিয়াম। বেলজিয়াম একটি গোল করেছিল, যা বাতিল হয়ে যায়। বিতর্ক সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত রিভালদো ও রোনালদোর গোলে জয় পায় ব্রাজিল।

ইংল্যান্ডের সামনে ডেনমার্ক। বেকহ্যামের দল সহজেই এগিয়ে যায়। তারপর আসে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ ইংল্যান্ড বনাম ব্রাজিল। পুরো পৃথিবী অপেক্ষা করছিল। একদিকে বেকহ্যাম, ওয়েন, ফার্ডিনান্ড। অন্যদিকে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও। ম্যাচে প্রথম গোল করে ইংল্যান্ড। মাইকেল ওয়েনের গতিময় দৌড়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে ইংলিশ সমর্থকরা। কিন্তু ব্রাজিল কখনও সহজে হার মানে না। রিভালদো সমতা ফেরালেন। তারপর এলো সেই মুহূর্ত। প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক পেল ব্রাজিল। সবাই ভেবেছিল ক্রস আসবে। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যানও সেটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু রোনালদিনিও অন্য কিছু ভেবেছিলেন। বল উড়ে গেল। সোজা জালে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর গোল। আজও বিতর্ক আছে তিনি কি সত্যিই শট নিতে চেয়েছিলেন? হয়ত। হয়ত না। কিন্তু গোলটি অমর। যদিও কিছুক্ষণ পর লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন রোনালদিনিও, তবুও দশজন নিয়ে ম্যাচ জিতে যায় ব্রাজিল। বিশ্ব বুঝতে পারে এই দলকে থামানো কঠিন।

দক্ষিণ কোরিয়ার যাত্রা হয়ে উঠছিল আরও নাটকীয়। প্রথমে ইতালিকে হারাল তারা। অতিরিক্ত সময়ে আহন জুং-হোয়ানের গোল দেশকে উল্লাসে ভাসিয়ে দিল। কিন্তু ম্যাচে রেফারিং নিয়ে শুরু হলো বিতর্ক। ইতালিয়ানরা ক্ষুব্ধ। কেউ কেউ একে ‘ফুটবল ষড়যন্ত্র’বললেন। এরপর স্পেনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের বিতর্ক। দুটি স্প্যানিশ গোল বাতিল। টাইব্রেকারে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়। এশিয়ার একটি দল প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে। ফুটবল বিশ্ব বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

জার্মানি খুব বেশি আলোচনায় ছিল না। কিন্তু তাদের ছিল অলিভার কান। অসাধারণ। অদম্য। অপরাজেয়। একের পর এক ম্যাচে তিনি জার্মানিকে বাঁচিয়েছেন। প্যারাগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া তার সামনে থেমে গেছে। তিনি যেন গোলপোস্টের সামনে এক মানব প্রাচীর।

সেমিফাইনালে ব্রাজিলের সামনে তুরস্ক। আবারও রোনালদো। আবারও গোল। ব্রাজিল ফাইনালে। জার্মানি হারাল দক্ষিণ কোরিয়াকে। ফাইনাল নিশ্চিত।

৩০ জুন, ইয়োকোহামা। ব্রাজিল বনাম জার্মানি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই দুই দল ফাইনালে মুখোমুখি। ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তেজনা। জার্মানি জানে, রোনালদোকে থামাতে হবে। ব্রাজিল জানে, অলিভার কানকে পরাস্ত করতে হবে। প্রথমার্ধে গোল নেই। দ্বিতীয়ার্ধে আসে সেই মুহূর্ত। রিভালদোর শট কান ঠিকমতো ধরতে পারলেন না। বল ছিটকে পড়ল সামনে। সেখানে অপেক্ষায় রোনালদো। গোল। ১-০। স্টেডিয়াম কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ পর আবার আক্রমণ। রিভালদো বল ছেড়ে দিলেন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। রোনালদো এগিয়ে এলেন। শট। গোল। ২-০। সব শেষ। ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। পঞ্চমবার। একটি নতুন রেকর্ড।

রোনালদো? তিনি সম্পূর্ণ করলেন নিজের অসমাপ্ত গল্প। চার বছর আগে ১৯৯৮ সালের ফাইনালের আগে রহস্যময় অসুস্থতা তাঁকে কেড়ে নিয়েছিল স্বপ্ন। চার বছর পর তিনি ফিরলেন। আর ফিরলেন রাজা হয়ে। আট গোল করে জিতলেন গোল্ডেন বুট। জিতলেন বিশ্বকাপ। জিতলেন কোটি মানুষের হৃদয়। ফাইনাল শেষে যখন তিনি ট্রফি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটি ছিল শুধু একজন ফুটবলারের বিজয় নয়। সেটি ছিল ব্যথার বিরুদ্ধে বিজয়। সন্দেহের বিরুদ্ধে বিজয়। পতনের বিরুদ্ধে বিজয়।

২০০২ সালের বিশ্বকাপ শুধু ব্রাজিলের পঞ্চম শিরোপাই নয় এশিয়ার আত্মপ্রকাশ আর সেনেগালের সাহসের গল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার বিস্ময়, অলিভার কানের একক বীরত্ব ও রোনালদিনিওর জাদুর গল্প। ফুটবলের ভৌগোলিক সীমা ভেঙে যাওয়ার এবং রোনালদোর ফেরার গল্প।

ফুটবলের ইতিহাসে অনেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এসেছে, অনেক নায়ক জন্ম নিয়েছে। কিন্তু খুব কম গল্পই এত গভীরভাবে মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, যতটা ছুঁয়েছে ২০০২ সালের সেই ব্রাজিলকে। যে ব্রাজিল শুধু ট্রফি জেতেনি। যে ব্রাজিল পৃথিবীকে শিখিয়েছিল কখনও কখনও সবচেয়ে সুন্দর বিজয় আসে সবচেয়ে অন্ধকার সময় পার হয়ে। আর ২০০২ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয় হয়ে আছে আশা, ফিরে আসা, বিস্ময় এবং অমরত্বের এক উজ্জ্বল মহাকাব্য।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102