মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৬:৩১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হঠাৎ তানিয়া বৃষ্টির মৃত্যুর গুজব ক্রিকেটার নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে ব্যভিচার মামলার রায় বুধবার কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারীদের সচেতনতার প্রতি গুরুত্বারোপ নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে ঋণ পাচ্ছেন ১০ লাখ টাকা যত দিন বেঁচে থাকব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আছি : দেব রাজনীতি থেকে অবসরের সম্ভাবনা নাকচ শেখ হাসিনার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ ০৩ হাজার ৮৯০ কোটি টাকার ১০ (দশ) প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল

হাওরের প্রতিবেশ বিপন্ন, হুমকিতে জীবন-জীবিকা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

কত কষ্ট কইরা ক্ষেতটা করছিলাম। আট কাডা (কাঠা) ক্ষেত সবডা পানিতে ডুইব্বা গেছে।

কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের বরান্তর গ্রামের কৃষক ইদ্রিছ মিয়া। বয়স ৭০  পেরিয়েছে।পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধানক্ষেত থেকে কোনোমতে কিছু আধাপচা  ধান সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। পরে তা সড়কের পাশে শুকানোর চেষ্টা করছিলেন। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ, সামনে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ হিসাব।
ইদ্রিছ মিয়ার দুর্দশা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

 

জেলার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, মদন ও কলমাকান্দার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ঘুরে কৃষক, জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দশক আগেও এসব এলাকায় বৈশাখের শেষ দিকে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিত। কিন্তু এখন চৈত্র মাসের শুরু থেকেই উৎকণ্ঠা ঘিরে ধরে হাওরপারের মানুষকে।

সম্প্রতি মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর সড়ক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক কিলোমিটারজুড়ে কৃষকেরা ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত। কেউ নৌকায় করে ধান নিয়ে আসছেন, কেউ সড়কের পাশে ছড়িয়ে ধান শুকাচ্ছেন।

মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের গৃহবধু রোকেয়া বলেন, ‘সমিতি থাইক্যা কিস্তিতে ট্যাহা লইয়্যা ক্ষেতটি করছিলাম। সবডি (পুরোটা)  ক্ষেত পানিতে ডুইব্বা গেছে। কিছু ধান লইতাম হারছি। যেডি লইছিলাম, হেইনও অনেক ধান পইচ্ছা গেছে। অহন কিছু ধান কোনোমতে শুকাইতাছি, যাতে অন্তত ভাত খাওনের খোরাকিডা মিলে।’

হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা বছরের অধিকাংশ সময় অপেক্ষা করেন একটি মাত্র ফসলের জন্য; সেটি হলো বোরো ধান। সেই ধান ঘরে ওঠার আগেই যদি উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে, তাহলে কয়েক মাসের শ্রম মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যায়। ২০২২ সালের আগাম বন্যার ভয়াবহতা এখনও ভুলতে পারেনি অনেক কৃষক। সেই বন্যায় নেত্রকোনার হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়। ঋণ নিয়ে চাষ করা অনেক কৃষক ফসল হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ২০২৬ সালেও।

নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ২০২৬ সালে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় জেলায় মোট ১৭ হাজার ৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর। হাওর এলাকার ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

উপপরিচালক বলেন, ‘এ দুর্যোগে জেলায় মোট ৭৭ হাজার ৩৩৬ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের কৃষকের সংখ্যা ৩৮ হাজার ২৩৮ জন। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী জেলায় ফসলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলেই ক্ষতির পরিমাণ ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে হাওরের মৎস্য সম্পদেও।

খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের জেলে রিটন মিয়া বলেন, একসময় খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জের হাওরে প্রচুর পাবদা, টেংরা, গুতুম, খলিসা ও বাইন মাছ পাওয়া যেত। এখন এসব মাছের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। হাওরের পানির গভীরতা, প্রবাহ ও প্রজনন পরিবেশের পরিবর্তনের পাশাপাশি জলাশয় সংকুচিত হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন তিনি।

এদিকে, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকিও বেড়েছে। জেলার সোমেশ্বরী, উপদাখালী, কংস ও ধনু নদীর কোথাও তীব্র ভাঙন; কোথাও আবার পলি জমে নাব্যতা সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি ও বসতভিটা।

এ ব্যাপারে সমাজকর্মী  অধ্যাপক আল হেলাল তালুকদার বলেন, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র পরিবারগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে। ফসলহানি ও মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার বছরের একটি অংশ জীবিকার তাগিদে অন্য জেলায় গিয়ে শ্রম বিক্রি করছে। আবার কেউ কেউ স্থায়ীভাবে শহরমুখী হচ্ছে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘হাওরের পরিবেশ ও প্রকৃতি বিনষ্টের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ। এটি বন্ধে স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের একটি হলো হাওরাঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত করে এমন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়।’

কাসমির রেজা আরো বলেন, ‘পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে- এমন চলমান প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে তা অপসারণ করতে হবে। এছাড়া ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, খাল ও বিল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102