জাহিদ ইকবাল: বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, যোগাযোগ এমনকি বিনোদনের ধরনও এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময় বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই, নাটক, সিনেমা, খেলাধুলা কিংবা পারিবারিক আড্ডা। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও ওটিটি কনটেন্ট। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে মানবজীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একইসাথে সমাজের সামনে নতুন কিছু সংকটও তৈরি করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো—বিনোদনের আড়ালে ধীরে ধীরে নগ্নতা, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার।
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে অশালীন পোশাক, কৃত্রিম আবেদনময়তা, শরীর প্রদর্শন কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিও। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব কনটেন্টই সবচেয়ে দ্রুত ভাইরাল হয় এবং অধিক ভিউ অর্জন করে। ফলে একটি বড় অংশের তরুণ-তরুণী মনে করছে জনপ্রিয় হওয়ার সহজ উপায় হলো শরীরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা। “ভিউ” ও “ফলোয়ার” যেন এখন অনেকের কাছে ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার চেয়েও বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় টেলিভিশনের নাটক বা সিনেমা পরিবার নিয়ে একসাথে বসে দেখা যেত। সেখানে সামাজিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম কিংবা মানবিক বার্তা থাকত। কিন্তু বর্তমানে অনেক ওয়েব সিরিজ বা অনলাইন কনটেন্ট পরিবার নিয়ে বসে দেখার মতো নয়। বিনোদনের নামে সেখানে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠ দৃশ্য, অশ্লীল সংলাপ এবং যৌনতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনেক নির্মাতা মনে করছেন, সাহসী দৃশ্য ছাড়া দর্শক পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ধীরে ধীরে সুস্থ বিনোদনের জায়গা দখল করছে উত্তেজনাকেন্দ্রিক কনটেন্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত যৌন উত্তেজক কনটেন্ট মানুষের মনস্তত্ত্বে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক বিকাশের উপর এর প্রভাব ভয়াবহ। অল্প বয়সেই তারা এমন কিছু দেখছে, যা তাদের বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে বাস্তব জীবন, সম্পর্ক ও সামাজিক আচরণ সম্পর্কে তাদের ধারণা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে শিশুরাও অনলাইন জগতের অশ্লীল কনটেন্ট থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। পরিবার অনেক সময় বুঝতেই পারে না সন্তান মোবাইলে কী দেখছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে ব্যস্ত রাখার জন্য ছোট বয়সেই হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন, কিন্তু সেই ফোনের ভেতরে কী ধরনের কনটেন্ট প্রবেশ করছে, সে বিষয়ে তেমন নজরদারি নেই। ফলে খুব অল্প বয়সেই শিশুরা এমন দৃশ্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, সমাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নারীকে মানুষ নয়, বরং ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। বিজ্ঞাপন, মিউজিক ভিডিও কিংবা বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্টে নারীর শরীরকে ব্যবহার করা হচ্ছে দর্শক আকর্ষণের হাতিয়ার হিসেবে। এতে নারীর প্রতি সম্মানবোধ কমে যাচ্ছে এবং সামাজিকভাবে নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত “ট্রেন্ড” অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের অজান্তেই অশ্লীল প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছে। কে বেশি আবেদনময় ভিডিও বানাতে পারবে, কে বেশি আলোচনায় আসতে পারবে—এ যেন এক নীরব প্রতিযোগিতা। কিন্তু তারা হয়তো বুঝতে পারছে না, সাময়িক জনপ্রিয়তার জন্য তারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর অনেক কনটেন্টে সহিংসতা, মাদক, অবৈধ সম্পর্ক এবং অশ্লীলতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনেক সময় এসব কনটেন্টকে “মুক্তচিন্তা” কিংবা “আধুনিকতা”র মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আধুনিকতা কি সত্যিই সীমাহীন নগ্নতা শেখায়? সভ্যতা ও স্বাধীনতার অর্থ কি সামাজিক শালীনতাকে ধ্বংস করা? প্রকৃত আধুনিকতা কখনোই মূল্যবোধ ধ্বংসের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষকে দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে শেখায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ খুবই দুর্বল। অনেকে বিষয়টি বুঝলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে “সেকেলে”, “রক্ষণশীল” কিংবা “ব্যাকডেটেড” বলে উপহাস করা হয়। ফলে ধীরে ধীরে অশ্লীলতা যেন সমাজে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম—সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। শুধু মোবাইল কিনে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; সেই মোবাইলের ব্যবহার নিয়েও নজর রাখতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ডিজিটাল সচেতনতা বিষয়ে কার্যকর শিক্ষা চালু করা জরুরি। বর্তমান প্রজন্মকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখালেই হবে না, প্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে। কারণ প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়; এর ভুল ব্যবহারই সমস্যা তৈরি করে।
রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর ও অশ্লীল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতি ও সৃজনশীল বিনোদনকে উৎসাহ দিতে হবে। ভালো নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে পারলে তরুণ সমাজ ধীরে ধীরে ইতিবাচক বিনোদনের দিকে আগ্রহী হবে।
গণমাধ্যমেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক লাভের জন্য সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন কনটেন্ট প্রচার করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় হতে পারে না। গণমাধ্যম সমাজকে যেমন প্রভাবিত করতে পারে, তেমনি সুন্দর পথও দেখাতে পারে। তাই তাদের উচিত সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমাজ হঠাৎ করে ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে যখন নৈতিকতা, লজ্জাবোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ কমে যায়, তখনই সমাজ ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। আজ আমরা যদি বিনোদনের নামে সীমাহীন অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিই, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করব।
বিনোদন মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিনোদন অবশ্যই সুস্থ, মানবিক ও রুচিশীল হতে হবে। বিনোদনের নামে যদি সমাজে অশ্লীলতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানসিক বিকৃতি ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা কখনোই প্রকৃত বিনোদন হতে পারে না। এখনই সময় সচেতন হওয়ার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসাথে উদ্যোগ নিলে অবশ্যই সুস্থ সংস্কৃতি ও মূল্যবোধভিত্তিক বিনোদনের পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
কারণ, একটি সভ্য সমাজ শুধু প্রযুক্তিতে উন্নত হলেই হয় না; সেই সমাজকে নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ হতে হয়।