ঢাকার উত্তর জনপদের ব্যস্ততম প্রবেশদ্বার খিলক্ষেত। এর পাশেই অবস্থিত নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা ও সংলগ্ন খিলক্ষেত টানপাড়া এক সময় পরিচিত ছিল স্নিগ্ধতা আর প্রশান্তির জন্য। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেই পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত ও অসহনীয় দৌরাত্ম্যে। তবে আজ দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ ৩০ এপ্রিল, ২০২৬; এই এলাকায় অটোরিকশা বন্ধের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের এক বছর পূর্ণ হলো। এক বছরের এই শান্তিময় পথচলা প্রমাণ করেছে, সাধারণ মানুষের ইস্পাত কঠিন ঐক্য থাকলে যেকোনো অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
এক বছর আগেও নিকুঞ্জ ও টানপাড়া এলাকায় অটোরিকশার কারণে জনজীবন ছিল অতিষ্ঠ। রাস্তার অব্যবস্থা, উচ্চশব্দের হর্ন আর অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া গতির কারণে শিশুদের স্কুল যাত্রা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আবাসিক এলাকার ভেতর বাণিজ্যিক এই যানবাহনের দাপটে শব্দদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে প্রতিটি পরিবার ঘরের ভেতর বসেও শান্তি খুঁজে পেত না। এলাকার এই পরিবেশগত ও সামাজিক অবনতি দেখে সচেতন বাসিন্দারা উপলব্ধি করেন—অন্য কেউ এসে সমস্যা সমাধান করে দেবে না, নিজেদের হারানো শান্তি নিজেদেরই ফিরিয়ে আনতে হবে। সেই নাগরিক চেতনার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে এক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।
এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে কোনো একক রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা ছিল না, ছিল না কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ। এর মূলে ছিল নিখাদ ‘নাগরিক চেতনা’। দল-মত নির্বিশেষে এলাকার প্রতিটি মানুষকে এক সুতায় গেঁথেছিল একটিই লক্ষ্য—নিরাপদ ও শান্তিময় বসবাস। স্থানীয় কল্যাণ সমিতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছিল। এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর সকল বাধা উপেক্ষা করার মানসিকতার কারণেই এলাকাটি এখন ঢাকার অন্যতম সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য জনপদে পরিণত হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বয়কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল। তবে এক বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নিতে নারাজ। নিজেকে এই আন্দোলনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র একজন উদ্যোক্তা দাবি করে তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো ব্যক্তির জয় নয়, বরং এটি আমাদের প্রাণপ্রিয় এলাকাবাসীর সম্মিলিত জয়। যারা সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গত বছরের ৩০ এপ্রিল রাস্তায় নেমেছিলেন, বিজয়টা একান্তই তাদের। আমি কেবল একজন সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র; আমাদের আসল শক্তি ছিল সর্বস্তরের এলাকাবাসীর ইস্পাত কঠিন ঐক্য। আজ যখন দেখি আমাদের এলাকার মডেল সারা দেশে আলোচিত হচ্ছে, তখন মনে হয়—সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ এক হলে অসাধ্য সাধন করা সম্ভব।”
অটোরিকশা বন্ধের এক বছরে নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়ার চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। শব্দদূষণ কমে আসায় বিশেষ করে প্রবীণ ও অসুস্থ বাসিন্দারা এখন অনেক বেশি স্বস্তিতে রয়েছেন। ভোরে এখন আর কর্কশ হর্নের শব্দ কানে তালা লাগায় না, বরং পাখির কিচিরমিচির শোনা যায়। নিকুঞ্জ এলাকার ভেতরে শিশুদের এখন আর অভিভাবকের হাত ধরে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয় না। স্কুলগামী শিশুরা এখন নিশ্চিন্তে পথ চলতে পারে, এমনকি অনেককে একাকী সাইকেল চালাতেও দেখা যায়। যাতায়াত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল হওয়ায় এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সান্ধ্যকালীন হাঁটাচলা করা সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
সমগ্র বাংলাদেশে অটোরিকশা বন্ধ করা যখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, তখন নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়া দেখিয়ে দিয়েছে সঠিক পথ। দেশের অনেক বড় বড় এলাকা যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে এই এলাকার মানুষের জয়গাথা এখন সবার মুখে মুখে। এটি কেবল একটি যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের দৃষ্টান্ত। স্থানীয়রা গর্ব করে বলছেন, সারা বাংলাদেশে কেউ অটোরিকশা বন্ধ করতে না পারলেও তারা পেরেছেন। এটি আজ কেবল একটি এলাকা নয়, বরং একটি আদর্শ চেতনার নাম যা সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
অটোরিকশা বন্ধের এই পথটি সহজ ছিল না। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের চাপ এবং নানা দিক থেকে আসা প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু এলাকাবাসীর ঐক্য ছিল পাহাড়ের মতো অটল। সেই সাহসী সিদ্ধান্তের পথ ধরেই আজ এক বছর পূর্ণ হলো। জাহিদ ইকবালের ভাষায়, “সব পরিবর্তনের পেছনে থাকে একটা সাহসী সিদ্ধান্ত, আর কিছু জেগে ওঠা মানুষ। নিকুঞ্জ আজ তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।” সাহসিকতা আর ধৈর্য দিয়েই এই এলাকার মানুষ সকল বাধা জয় করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে নাগরিক ঐক্য এক হলে অসম্ভব কেউ সম্ভব করা যায়।
এক বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়ার বাসিন্দারা মনে করেন, এই অর্জন ধরে রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে যে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি গত এক বছরে তৈরি হয়েছে, তা ভাঙা কঠিন। অটোরিকশা মুক্ত এই এক বছর কেবল একটি মাইলফলক নয়, বরং সুন্দর ও বাসযোগ্য আগামীর এক নতুন শপথ। শহরের যান্ত্রিকতার মাঝে এক টুকরো শান্তির নীড় হিসেবে নিকুঞ্জ টিকে থাকুক—আজকের দিনে এটাই সকলের প্রত্যাশা। এই বিজয় প্রতিটি সচেতন নাগরিকের, যারা বিশ্বাস করেছিলেন যে নিজেদের উদ্যোগেই ফিরিয়ে আনতে হবে হারানো পরিবেশ। নিকুঞ্জ আজ এক শান্ত ও স্নিগ্ধ জনপদ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।