বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৩ অপরাহ্ন

অস্ট্রেলিয়া নেওয়ার কথা বলে নেওয়া হয় নেপালে, তরুণের খোঁজ পাচ্ছেন না মা–বাবা

অনলাইন ডেক্স রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে শ্রমিক ভিসায় কলেজপড়ুয়া ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে চেয়েছিলেন ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন (৪৪)। এ জন্য জমি বিক্রি করে এবং এনজিও ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ১৫ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে।

তবে অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তে ছেলে সাকিব হোসেনকে (২১) নিয়ে যাওয়া হয় নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। সেখানে একটি হোটেলে রেখে সাকিবের পাসপোর্ট ও কাছে থাকা এক লাখ টাকা মূল্যের ডলার নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে জিম্মি করে আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। আলমগীর হোসেন আয়ের একমাত্র সম্বল ভ্যানটি ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। একটি সমিতি থেকে উচ্চ সুদে আরও এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি দালালকে দেন। এর পর থেকে তিনি ছেলের আর কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না।

আলমগীর হোসেনের বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামে।

ছেলেকে ফিরে পেতে আলমগীর হোসেন মামলা করেছেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি যশোরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল-১–এ মামলাটি করেন। আদালত বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। সে অনুয়ায়ী মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। মামলায় বাঘারপাড়া উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের মোকলেস মোল্যার ছেলে তরিকুল ইসলাম (৪৫) ও নাজমুল হোসেনকে (৩৫) আসামি করা হয়েছে।

৮ এপ্রিল আলমগীর হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ শতক জমির এক পাশে দুই কক্ষের একটি টিনের ঘর। ঘরের বারান্দায় দুই পাশে ইটের দেয়ালের দুটি ছোট কক্ষ। ঘরের পূর্ব পাশে ছোট একটি রান্নাঘর। আলমগীর হোসেন বলেন, তাঁর ২২ শতক জমি ছিল। এর মধ্যে ১৪ শতক ভিটাবাড়ি ও আট শতক জমিতে লিচুর বাগান। তাঁর ইঞ্জিনচালিত একটি ভ্যান ছিল। তাঁর তিন ছেলে-মেয়ে। দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সাকিব হোসেন বাঘারপাড়া উপজেলার ছাতিয়ানতলা ইউনাইটেড স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। ছোট মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। ভ্যান চালিয়ে তিনি ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাতেন।

আলমগীর হোসেন আরও বলেন, একই গ্রামের নাজমুল হোসেন দীর্ঘদিন বিদেশ ছিলেন। দুই বছর আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। নাজমুল ও তাঁর বড় ভাই তরিকুল ইসলাম অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিক পদে কিছু ভিসা পেয়েছেন বলে জানান। বেতন মাসে এক লাখ টাকা। তাঁরা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ছেলে সাকিব হোসেনকে অস্ট্রেলিয়ায় কোম্পানিতে শ্রমিক পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১৫ লাখ টাকা নেন।

ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে তড়িঘড়ি করে লিচুর বাগানসহ আট শতক জমি কম মূল্যে মাত্র ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেন বলে জানান আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, প্রথমে দুই দালালকে তিন লাখ টাকা দেন। কয়েক দিন পর দুই দালাল জানান, সাকিব হোসেনের অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা মঞ্জুর হয়েছে। এরপর তাঁরা আলমগীরকে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ভিসা মঞ্জুরের ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকা দাবি করেন। আলমগীর পাঁচটি এনজিও থেকে ঋণ করে এবং গ্রাম্য সমিতি থেকে উচ্চ সুদে ১১ লাখ টাকা নেন। জমি বিক্রির এক লাখ টাকা ও ঋণের ১১ লাখ টাকা তাঁদের দেন। তিন মাসের মধ্যে সাকিবকে অস্ট্রেলিয়ার নিয়ে কোম্পানির চাকরিতে যোগদান করিয়ে দেওয়া কথা। টাকা নেওয়ার পর তাঁরা সাকিবকে ঢাকার উত্তরায় নিয়ে মেডিক্যাল পরীক্ষা ও আঙুলের ছাপ নেন।

গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ওই দুই ভাই সাকিব হোসেনকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান বলে জানান আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর নেপালের কাঠমান্ডুতে নিয়ে একটি হোটেলে রাখেন। এরপর তাঁরা সাকিবের কাছে থাকা পাসপোর্ট ও এক লাখ টাকা মূল্যের ডলার নিয়ে নেন। কিন্তু ছেলের সঙ্গে মা-বাবার মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। সেখানে তাঁরা সাকিবকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাংলাদেশি দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। তিনি ভ্যান বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা ও সমিতি থেকে সুদে এক লাখ টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠান। এরপর তাঁরা আরও টাকা আদায়ের জন্য সাকিবকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। সাকিব বিষয়টি তাঁর মা-বাবাকে জানান।

আলমগীর হোসেন বুঝতে পারেন তাঁর ছেলে প্রতারণার শিকার হয়েছে। তাকে নেপালের হোটেলে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি তরিকুল ইসলাম ও নাজমুল হোসেনকে তাঁর ছেলেকে ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দেন। এ সময় তাঁরা আলমগীরের কাছে আরও তিন লাখ টাকা দাবি করেন। কোনো উপায় না পেয়ে তিনি মামলা করেছেন বলে জানান। মামলার পর থেকে দালালের লোকজন ফোন করে তাঁকে হুমকি দিচ্ছেন বলে তাঁর অভিযোগ। গত প্রায় এক মাস তিনি ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না।

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মাথা গোঁজার জমিটুকু ছাড়া সব জমি বিক্রি করেছি। আয়ের একমাত্র সম্বল ভ্যানটিও বিক্রি করে দিয়েছি। পাঁচটি এনজিও ও সমিতি থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা লোন নিয়েছি। সেখানে প্রতিদিন সুদ হচ্ছে। আয়ের কোনো পথ খোলা নেই। ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে সংসারে একটু সচ্ছলতা আনার জন্য সব টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়েছি। এখন আমার ছেলেরই খোঁজ পাচ্ছি না। দালালেরা লোকজন দিয়ে হুমকি দিচ্ছেন। একদিকে ছেলের চিন্তা অন্যদিকে ঋণের টাকার চিন্তা। রাতে ঘুম আসে না। বিদেশ আর যাওয়ার দরকার নেই, ছেলে ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরে আসুক, আমি তা-ই চাই।’

আলমগীর হোসেনের স্ত্রী সোনালী বেগম (৩৮) বলেন, ‘৯ মার্চ দুপুরে পুলিশ তদন্ত করতে বাড়িতে আসে। সেদিন ছেলের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তার কথা হয়। আমাদের সঙ্গেও সেদিন ছেলের কথা হয়। বিকেল থেকে তার ফোনে কল হলেও ফোন ধরেনি। ১২ মার্চ দুপুর থেকে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর থেকে তার সঙ্গে বাড়ির কারও কোনো কথা হয়নি। আমি আর পারছি না। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই।’

গত সোমবার বিকেলে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার কিসমত মাহমুদপুর গ্রামের তরিকুল ইসলাম ও নাজমুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পাওয়া যায়নি। মামলা করার পর থেকে তাঁরা পলাতক আছেন। এ সময় কল করলে তাঁদের দুজনের মুঠোফোন দুটি বন্ধ পাওয়া যায়।

তরিকুল ইসলামের স্ত্রী রুনা বেগমকে বাড়িতে পাওয়া গেল। স্বামী তরিকুল ইসলাম ও দেবর নাজমুল হোসেন কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাজমুল এখানে থাকেন না। তিনি মালয়েশিয়া থাকতেন। দেশে ফিরে তিনি শ্বশুরবাড়ি থাকতেন। এখন কোথায় আছেন জানেন না। তিনি বলেন, তরিকুল ঢাকায় থাকেন। কাঁচামালের ব্যবসা করেন। তাঁদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়েকে নিয়ে তিনি বাড়িতে থাকেন। মামলার বিষয় তিনি শুনেছেন জানিয়ে বলেন, ‘আমার স্বামী স্ট্রোক করেছিলেন। এখনো পুরোপুরি সুস্থ না। তিনি এসবের মধ্যে ছিলেন না। নাজমুলের জন্য আমার স্বামীকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাঘারপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোবিন্দ কুমার মণ্ডল বলেন, মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102