প্রচারণার মধ্যেই রোগী দেখা, প্রেসক্রিপশন দেওয়া
অনলাইন ডেস্ক
-
আপডেট টাইম:
বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
দুপুর গড়িয়ে রাত। প্রত্যন্ত গ্রামের সারিসারি ঘরে ঘেরা একটি উঠান। সেখানে টেবিল-চেয়ার সাজানো। টেবিলের পেছনে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা সাদা-কালো নির্বাচনী ব্যানার।সেখান থেকে হ্যান্ড মাইকে ভেসে আসছে শ্রমজীবী মানুষের কথা। কারো অভিযোগ, কারো দাবি, কারো আবার দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।উঠান বৈঠকের মাঝেই টেবিলের সামনে থামছে জনা কয়েক নারী-পুরুষ। কেউ এসেছেন ভোটের কথা বলতে।কেউ শরীরে অসুখ নিয়ে। রাজনীতির ভিড় আর রোগীর সারির মাঝখানে বসে আছেন ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। তিনি বরিশাল-৫ আসনের বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত এবং গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী। পরনে সাদা অ্যাপ্রোন নেই।চেম্বারের পরিচিত কোনো সাজও নেই। সামনে একটি কাঠের টেবিল, পাশে কয়েকটি চেয়ার। এক হাতে ভোটের লিফলেট, অন্য হাতে স্টেথোস্কোপ। প্রচারণার শুরু থেকেই এভাবেই বিনা ফিতে রোগী দেখছেন ডা. মনীষা।বরিশালে মনীষার পরিচয় শুধু প্রার্থী হিসেবে নয়।অনেকের কাছে তিনি ‘গরিবের ডাক্তার’। শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এমবিবিএস পাস করার পর ৩৪তম বিসিএসে সুপারিশ পেলেও সরকারি চাকরির পথে হাঁটেননি। বেছে নিয়েছেন অন্য রাস্তা। সেই রাস্তায় হেঁটেঁ হেঁটেঁই প্রচারণার পাশাপাশি ফ্রিতে রোগী দেখেন তিনি। শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও মনীষা পরিচিত। এখন নির্বাচনের সময়। তাই সকাল হলেই বেরিয়ে পড়েন প্রচারণায়। হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলেন, শোনেন। আর সেই ফাঁকে রোগী দেখেন। কারণ তাঁর মতে, ভোট চাইতে গেলে আগে সমস্যা শুনতে হয়।ভোটারদের সমস্যার তালিকায় থাকে উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, বহুদিনের গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা। তাই অনেকের হাতে প্রচারপত্রের সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে প্রেসক্রিপশনও।গত সোমবার (২ জানুয়ারি) বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের বিল্লবাড়ি এলাকায় এমন এক উঠান বৈঠকে ছুটে আসেন কয়েকজন রোগী। বৈঠক থামিয়ে মনীষা ব্যস্ত হয়ে পড়েন চিকিৎসায়। এক বৃদ্ধা বললেন, ‘ভোট দিতে আসিনি। মুখ-পা ফুলে গেছে। উনি বললেন, আগে ওষুধ খান, ভোট পরে হবে।’উঠানের এক পাশে তখন স্লোগান চলছে। কর্মীরা লিফলেট বিলি করছেন। কেউ কেউ এসে কানে কানে কিছু বলছেন। মনীষা শুধু মাথা নেড়ে আবার রোগীর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখে বুঝিয়ে দিচ্ছেন নিয়ম।শহরের মানুষ বলছেন, এটা নতুন কিছু নয়। নির্বাচনের আগে যেমন, নির্বাচনের সময়েও তেমন। সরকারি হাসপাতাল গ্রাম থেকে দূরে। বেসরকারি চিকিৎসা অনেকের সাধ্যের বাইরে। মনীষার এই ভ্রাম্যমাণ চেম্বারই এখন শ্রমজীবিদের ভরসা।মনীষার এই পথচলার পেছনে রয়েছে আন্দোলনের ইতিহাস। ২০১৮ সালে ব্যাটারিচালিত রিকশাশ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। একই বছর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেন। সিল মারা ব্যালট হাতে নেওয়ার ঘটনায় হামলার শিকারও হন।তবে প্রশ্নও উঠছে। প্রচারণা আর চিকিৎসা একসঙ্গে চলা কী শুধুই মানবিকতা, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? নির্বাচন বিশ্লেষক রফিকুল আলম বললেন, ‘মনীষার এই ফ্রি চিকিৎসা বছরজুড়েই চলে। এটা ভালো কাজ নিশ্চয়ই। কিন্তু ভোটের সময় হলে সবকিছুই রাজনীতির রং নেয়।’মনীষার উত্তর সংক্ষিপ্ত। তিনি বললেন, ‘আমি আগে চিকিৎসক। মানুষ অসুস্থ হলে আগে চিকিৎসা, পরে ভোট। রাজনীতি করছেন, কিন্তু পেশা ছাড়েননি।’সন্ধ্যার দিকে ভিড় আরো বাড়ে। কয়েকজন তরুণ ভোটের কথা বলতে এসে নিজেরাই সারিতে দাঁড়িয়ে পড়েন। আরিফুর রহমান নামের একজন বলেন, ‘ভোট চাইতে এলে উনি আগে জিজ্ঞেস করেন, শরীর কেমন ‘সূর্য ঢলে পড়লে হ্যান্ড মাইক বন্ধ হয়। রাত ৮টার পর প্রচারণা থামে। কিন্তু উঠানের আলো তখনও জ্বলছে। শেষ রোগীটি বেরিয়ে গেলে মনীষা চেয়ার ছেড়ে ওঠেন। বাইরে আবার রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হবে। তবু এই কয়েক ঘণ্টায় প্রচারণার ভিড়ে প্রেসক্রিপশনই ছিল তাঁর মূল কাজ।ভোটের লড়াই যতই তীব্র হোক, এই উঠানে এখনও মনীষার কাছে আগে রোগী, পরে প্রার্থী। প্রশ্নফাঁসবিরোধী আন্দোলন থেকে সুন্দরবন রক্ষা, তনু হত্যার বিচার কিংবা বস্তি উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন- রাজপথে তাঁর উপস্থিতি নতুন নয়।বরিশালের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ শাজেদার কথায়, করোনা মহামারির সময় ফ্রি অক্সিজেন, অ্যাম্বুল্যান্স, ত্রাণ বিতরণ আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার কাজ মনীষাকে শ্রমজীবী মানুষের আরো কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। ‘মানবতার বাজার’-এর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছেছিল ত্রাণ।
নিউজটি শেয়ার করুন..
-
-
-
- Print
- উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..