শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

কুখ্যাত মাফিয়া পরিবারের ১১ সদস্যকে কেন তড়িঘড়ি করে মৃত্যুদণ্ড দিল চীন?

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
চীন উত্তর-পূর্ব মায়ানমারের একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ পরিবারের ১১ জন সদস্যর দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। তাদের গত সেপ্টেম্বরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন চীন এত দ্রুত পদক্ষেপ নিল কুখ্যাত মাফিয়া পরিবারের ১১ জন সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য?

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, চীন বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় বেশি মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর সঠিক সংখ্যাটি রাষ্ট্রটি গোপন রাখে।

দেশটিতে দুর্নীতির জন্য কর্মকর্তাদের প্রায়ই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মিং পরিবারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অনেক বেশি গুরুতর ছিল।২০০৯ সাল থেকে মায়ানমারের দরিদ্র শান রাজ্যের প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী শহর লাউক্কাইং-এ মিং, বাউ, ওয়েই এবং লিউ গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে। মায়ানমারের বর্তমান অভ্যুত্থান নেতা জেনারেল মিন অং হ্লাইং ১৯৮০ সাল থেকে লাউক্কাইং ও আশপাশের অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকারী জাতিগত বিদ্রোহী বাহিনী এমএনডিএএ–কে হটিয়ে দিতে একটি সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন।

ওই অভিযানের পরই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতার দখল নেয়।পরবর্তী সময় ‘চারটি পরিবার’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠী ক্ষমতায় সুদৃঢ় অবস্থান গড়ে তোলে এবং আফিম ও মেথামফেটামিন উৎপাদনের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে ক্যাসিনোভিত্তিক ব্যবসা এবং শেষ পর্যন্ত অনলাইন জালিয়াতিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।

তারা মায়ানমারের সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ ছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর রাজধানী নে পি তাওতে জেনারেল মিন অং হ্লাইং লিউ বংশের পিতৃপুরুষ লিউ ঝেংজিয়াংকে সংবর্ধনা দেন এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রাখার জন্য তাকে একটি সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করেন।

লিউ ঝেংজিয়াংয়ের ফুলি লাইট গ্রুপের মায়ানমারজুড়ে একাধিক লাভজনক ব্যবসা ছিল। একই সঙ্গে ‘চার পরিবার’-এর অন্যান্য সদস্যরাও সামরিক-সমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউএসডিপির প্রার্থী হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন।

তবে লাউকাইংয়ে তাদের পরিচালিত জালিয়াতি চক্রগুলো ছিল অত্যন্ত নৃশংস। এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের জালিয়াতি চক্রগুলোর তুলনায় এগুলো অনেক বেশি নিষ্ঠুর ছিল এবং সেখানে নির্যাতন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। হাজার হাজার চীনা কর্মীকে সেখানে ভালো বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল।

কিন্তু তারপর তারা সেখানে বন্দি হয়ে পড়ে। তাদের জোর করে জালিয়াতি চালাতে বাধ্য করা হয়েছিল , যেখানে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীও ছিলেন চীনা। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এবং আটকে পড়াদের পরিবারের কাছ থেকে অভিযোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় বেড়ে যায়।লাউকাইংয়ের সবচেয়ে কুখ্যাত কম্পাউন্ডটির নাম ছিল ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’, যা মিং পরিবার পরিচালিত করত। ২০২৩ সালের অক্টোবরে পালানোর চেষ্টার সময় রক্ষীরা বেশ কয়েকজন চীনা নাগরিককে হত্যা করে। চীনা কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। চীনের স্পষ্ট সমর্থনে এমএনডিএএ  ও তাদের মিত্ররা চলমান গৃহযুদ্ধের অংশ হিসেবে মায়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে লাউক্কাইং শহর দখল করে পুনরুদ্ধার করে। এমএনডিএএ এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা জালিয়াতিভিত্তিক ব্যবসা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অভিযানের সময় তারা ‘চারটি পরিবার’-এর প্রধান নেতাকে আটক করে এবং পরিবারের ৬০ জনেরও বেশি আত্মীয়স্বজন ও সহযোগীকে চীনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবারের শীর্ষ নেতা মিং জুয়েচ্যাং গ্রেপ্তার হওয়ার পর আত্মহত্যা করেন।

চীনা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সময় পরিবারের একজন সদস্য স্বীকার করেছেন, তিনি কেবল তার শক্তি প্রদর্শনের জন্য এলোমেলোভাবে বেছে নেওয়া কাউকে হত্যা করেছিলেন। পরিবারগুলোর প্রতি কঠোর আচরণের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য চীন এই বিবরণগুলো প্রকাশ করেছে। বাউ পরিবারের পাঁচজন সদস্যও মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, অন্যদিকে ওয়েই এবং লিউ পরিবারের বিচার এখনও শেষ হয়নি।

ওই চারটি পরিবার জাতিগতভাবে চীনা ছিল এবং ইউনান সীমান্তের চীনা অংশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল। তাদের চালানো নির্যাতন চীনের সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি ঘটছিল, আর সে কারণেই লাউক্কাইংয়ে জালিয়াতিভিত্তিক ব্যবসার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চীন থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করে দুই চীনা ব্যবসায়ীকে প্রত্যর্পণ করিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিশাল জালিয়াতি সাম্রাজ্য পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তাদের একজন শে ঝিজিয়াং, যিনি মায়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত কারেন রাজ্যে একটি সম্পূর্ণ শহর গড়ে তুলেছিলেন, অন্যজন চেন ঝি, যিনি কম্বোডিয়ায় তার প্রিন্স গ্রুপের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ ও প্রভাব অর্জন করেন।

চীন সরকার জালিয়াতি কম্পাউন্ডে কাজ করা হাজার হাজার নাগরিককে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। তবে জালিয়াতির এই ব্যবসা ইতোমধ্যে নিজেকে নতুনভাবে অভিযোজিত ও বিস্তৃত করেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও এটি এখনও কম্বোডিয়ার সবচেয়ে বড় অবৈধ ব্যবসাগুলোর একটি বলে মনে করা হয়, যদিও এই কার্যক্রম বন্ধে দেশটির সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে এই জালিয়াতি চক্রগুলো মায়ানমারের নতুন নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর ফলে থাই–মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত কে কে পার্ক ও শোয়ে কোক্কোর মতো বহুল পরিচিত জালিয়াতি কমপ্লেক্সগুলো বন্ধ করতে বাধ্য করা হলেও, পুরো নেটওয়ার্কটি এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102