আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপের কারণে ৩০ বছর পেরোনোর পর থেকেই মানুষের শরীরে নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব রোগের অনেকগুলোরই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে সময়মতো শনাক্ত না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শরীরের ভেতরের পরিবর্তনগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
পাশাপাশি সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ৩০ বছরের পর হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই এই বয়স থেকে কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করানো অত্যন্ত জরুরি।
রক্তচাপ পরীক্ষা
৩০ বছর বয়স থেকে প্রতি বছর অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অনেক ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গ ছাড়াই উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন মানুষ। রক্তচাপ ১২০/৮০ এর বেশি হলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লবণ কম খাওয়া, হাঁটাহাঁটি ও মানসিক চাপ কমানোর মতো পদক্ষেপ আগেভাগে নেওয়া সম্ভব।
কোলেস্টেরল পরীক্ষা
লিপিড প্রোফাইল টেস্টে এলডিএল, এইচডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইড ও মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা জানা যায়।
এলডিএল বেশি হলে ধমনিতে চর্বি জমে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। খাদ্যতালিকায় ওটস, বাদাম ও মেথি যোগ করলে ভালো কোলেস্টেরল বাড়তে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস পরীক্ষা
ফাস্টিং ব্লাড সুগার পরীক্ষার মাধ্যমে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ–২ ডায়াবেটিস শনাক্ত করা যায়। বিশেষ করে যাঁদের ওজন বেশি বা জীবনযাপন অলস, তাদের জন্য এই পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নারীদের জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং
৩০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের প্রতি তিন বছর অন্তর প্যাপ স্মিয়ার বা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এইচপিভিসহ কো-টেস্ট করানো উচিত।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রধান কারণ এইচপিভি সংক্রমণ। নিয়মিত স্ক্রিনিং ও টিকাদানের মাধ্যমে এই ক্যান্সারে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ত্বকের ক্যান্সার পরীক্ষা
প্রতি মাসে নিজের ত্বক পরীক্ষা করা এবং বছরে একবার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করানো জরুরি। ত্বকের দাগ বা তিলের পরিবর্তন শনাক্ত করতে এবিসিডিই নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে—অসমতা, অনিয়মিত প্রান্ত, রঙের পরিবর্তন, ৬ মিলিমিটারের বেশি ব্যাস এবং দাগের আকৃতির পরিবর্তন।
চোখের পরীক্ষা
প্রতি এক থেকে দুই বছর অন্তর চোখের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করলে গ্লুকোমা, ক্যাটার্যাক্ট ও দৃষ্টিজনিত বিভিন্ন সমস্যা আগেভাগে শনাক্ত করা যায়। এই পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক লক্ষণও ধরা পড়ে।
দাঁতের পরীক্ষা
নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ ও পেশাদার ক্লিনিং মাড়ির রোগ ও দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করে। মাড়ির সংক্রমণ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এক্স-রে করলে লুকানো ক্যাভিটি বা হাড় ক্ষয়ের বিষয়টিও জানা যায়।
থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট
প্রতি বছর পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের কার্যকারিতা যাচাই করা উচিত। থাইরয়েডের ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্লান্তি, ওজন পরিবর্তন, উদ্বেগ ও হৃদকম্পনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরিবারে থাইরয়েডের ইতিহাস থাকলে এই পরীক্ষা আরও জরুরি।
সব মিলিয়ে, ৩০ বছরের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেবল রোগ শনাক্তই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার অন্যতম চাবিকাঠি।
সূত্র: এনডিটিভি