ইংল্যান্ডে কোন পদে দায়িত্ব পালন করা সবচেয়ে কঠিন? হ্যারি কেইনরা যখন ফুটবল বিশ্বকাপে ৬০ বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর চেষ্টা করছেন, তখন ইউটিউবে অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিডিও বানাচ্ছেন কোচ টমাস টুখেলকে নিয়ে। তাদের পূর্বাভাস, শিরোপা ঘরে না ফিরলে টুখেল তাঁর দায়িত্ব হারাবেন।
শুধু কনটেন্ট ক্রিয়েটর নয়, প্রভাবশালী গণমাধ্যমও একই রকম পূর্বাভাস দিচ্ছে। যদি সত্যিই টুখেলকে সরানো হয় তাহলে প্রায় ১৬ বছরের মধ্যে সপ্তম কোচ বা ম্যানেজার পাবেন ইংলিশ ফুটবলাররা। কাকতালীয় বিষয় হলো- কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের মাধ্যমে ব্রিটিশ নাগরিকরাও ১৬ বছরে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে- ইংল্যান্ড ফুটবল দলের কোচের সঙ্গে কেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদের মিল খোঁজা হচ্ছে? উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের পদত্যাগের ধরনের মধ্যে। এশিয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাধারণত রাজপথের আন্দোলন ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেয়। তবে যুক্তরাজ্যের গত ছয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা কোনো কেলেঙ্কারির পর তারা পদত্যাগ করেছেন নিজ দলের নেতাদের চাপে।
একইভাবে কোনো টুর্নামেন্টে ব্যর্থতার পর ইংল্যান্ড ফুটবল দলের ম্যানেজারের ভাগ্যেও জুটেছে গণমাধ্যম ও শিরোপা খরা ঘোচাতে না পারার চাপ। সেই তালিকায় টুখেলের আগে আছেন- লি কার্সলি, গ্যারেথ সাউথগেট, স্যাম অ্যালারডাইস, রয় হজসন ও স্টুয়ার্ট পিয়ার্স। আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমারের আগে ব্রিটিশ নাগরিকরা দেখেছেন- ঋষি সুনাক, এলিজাবেথ লিজ ট্রস, বরিস জনসন, থেরেসা মে ও ডেভিড ক্যামেরনকে।
প্রধানমন্ত্রীদের পদত্যাগের ধরনকে ফুটবল দলের ম্যানেজারের সঙ্গে তুলনা করেছেন যুক্তরাজ্যের একজন সরকার বিশ্লেষকও। গত এপ্রিল মাসে দ্য কনভারসেশনের এক নিবন্ধে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সরকার’ বিভাগের অধ্যাপক পল হোয়াইটলি লিখেন, ‘বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীরা তাদের পদে প্রায় ততটাই অনিরাপদ, যতটা ফুটবল দলের কোচরা থাকেন।’
স্টারমার কেন পদত্যাগ করলেন
চলতি বছরের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতার দিকে তাকালে দেখা যায়, স্টারমার পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন গত ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত কয়েক লাখ নথি প্রকাশ করে মার্কিন বিচার বিভাগ। তাতে নাম আসে স্টারমারের দল লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা পিটার ম্যান্ডেলসনের।
প্রকাশিত একটি নথির তথ্য অনুযায়ী, ম্যান্ডেলসন যুক্তরাজ্যের বাজার ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য এপস্টেইনের কাছে পাচার করেছিলেন। আর তাঁকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। সে সময় লেবার এমপিদের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান তাদের এক প্রতিবেদনে লিখে, ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্তই স্টারমারের নেতৃত্ব টিকে থাকা নিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সোমবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর দ্য ইনডিপেনডেন্ট লিখেছে, সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভরাডুবিই স্টারমারের সরে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ। এর সঙ্গে গণমাধ্যমটি সরকারের আরও কয়েকটি নীতিগত বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন- প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির পদত্যাগ। এছাড়া, প্রতিবন্ধী ও দুই সন্তান আছে এমন পরিবারের জন্য ভাতা কমানোর সিদ্ধান্তও স্টারমার সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলে।
স্টারমারের আমলে লেবারের জনপ্রিয়তা এতটাই কমেছে যে, ইউগভ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৮ শতাংশ ভোটার দলটিকে আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে স্টারমার যখন পদত্যাগের ঘোষণা দেন তখন এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, ‘প্রিয় দেশকে এগিয়ে রাখার উদ্দেশে আমি প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ কারণেই লেবার পার্টির নেতা হিসেবে পদত্যাগ করব।’ পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে জুলাই মাসে। ততদিন স্টারমার দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরুর আগেই নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেবেন।
স্টারমারের এই পদত্যাগের ঘোষণা এসেছে গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল হারার পর স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শতাধিক এমপি সরে দাঁড়ানোর ‘আল্টিমেটাম’ দেন। মে মাসে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান লেবার এমপি ও সাবেক জুনিয়র মন্ত্রী ক্যাথরিন ওয়েস্ট। এরপর একে একে নেতা হওয়ার লড়াইয়ে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে আসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ও গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের নাম।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অনেক এমপি বার্নহামকে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। পার্লামেন্টের সদস্য হতে ইংল্যান্ডের মেইকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন বার্নহাম। গত শুক্রবারের সেই নির্বাচনে তিনি জিতেছেন। এর দুইদিন পর স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন।
আগের ৫ প্রধানমন্ত্রী
লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীদের মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার এই চক্র শুরু হয় ২০১৬ সালে। ব্রেক্সিট বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত গণভোটে হারের পর দায়িত্ব ছাড়েন ডেভিড ক্যামেরন। কনজারভেটিভ পার্টির এই নেতা ইইউ-তে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন।
২০১৯ সালে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায়ে সরে যেতে বাধ্য হন কনজারভেটিভের নেতা থেরেসা মে। এরপর ক্ষমতায় বসেন দলটির আরেক নেতা বরিস জনসন। তাঁর আমলের ডেপুটি চিফ হুইপ ক্রিস পিঞ্চারের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছিল। সে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কনজারভেটিভের অভ্যন্তরীণ আস্থা হারান বরিস। পদত্যাগ করেন ২০২২ সালে।
যুক্তরাজ্যের পরবর্তী তিন প্রধানমন্ত্রীদের মেয়াদ অনেকটা লন্ডনের আবহাওয়ার মতো। কোনো পূর্বাভাস না মেনে- এই রোদ তো এই বৃষ্টি। লিজ ট্রস, ঋষি সুনাক ও স্টারমারের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে। ২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর লিজ একই বছর পদত্যাগ করেন। অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা ‘মিনি বাজেট’ প্রণয়ন করে তিনি নিজ দল কনজারভেটিভের আস্থা হারান।
ব্রিটেনে কনজারভেটিভ পার্টির দীর্ঘ শাসনামলে জন্ম নেওয়া নানা বিতর্কের প্রভাব পড়ে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় সেই নির্বাচনে হেরে পদত্যাগ করেন ঋষি সুনাক। বিপরীতে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি, প্রধানমন্ত্রী হন কিয়ার স্টারমার। কিন্তু তিনিও মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলেন না।
‘দ্য আনগভর্নেবল কান্ট্রি’
গত মে মাসে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের দাবি ওঠার পর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য গার্ডিয়ান। শিরোনাম ছিল- ‘দ্য আনগভর্নেবল কান্ট্রি? হোয়াই ব্রিটেন কিপস লুজিং প্রাইম মিনিস্টারস’। এতে প্রতিবেদক টম ক্লার্ক প্রশ্ন তোলেন, ব্রিটেনের শাসন পরিচালনার কাজ কি অসম্ভব হয়ে উঠছে?
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে স্থবিরতা এবং সরকারি ঋণের বোঝা ব্রিটিশ রাজনীতিকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে লিজ ট্রসের সময়ে বন্ড মার্কেটের অস্থিরতা এবং ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। এ ছাড়া, ব্রেক্সিট, গাজা ইস্যু এবং আবাসন খাতের মতো বিষয়গুলো ব্রিটিশ সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর ফাটল তৈরি করেছে। এই বহুমুখী বিভাজন সামাল দিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট ধরে রাখা বর্তমানের যেকোনো নেতার জন্য বেশ কঠিন।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, গঠনমূলক কাজের চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তিক্ততা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন- থেরেসা মে তাঁর মেয়াদের শেষ দুই বছর কেবল রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াই এবং ব্রেক্সিট চুক্তি সম্পন্ন করার পেছনে ব্যয় করেছিলেন। ফলে অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো অবহেলিত থাকে।
মন্ত্রিসভায় ঘনঘন পরিবর্তনকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। টম ক্লার্ক লিখেছেন, সরকারের মধ্যে ধারাবাহিকতার অভাব দেখা দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নেওয়া সম্ভব হয় না। আর অস্থিরতা সামাল দিতে গিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না প্রধানমন্ত্রীরা। তখন ব্যর্থতার অভিযোগে তাদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।