ভারতে গরুকে জাতীয় পশুর মর্যাদা দেওয়ার দাবি তুলেছেন আজমেঢ় শরিফ দরগার বিশিষ্ট মৌলভী সৈয়দ সারেয়ার চিস্তি। একই সঙ্গে তিনি সারা দেশে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা, কুরবানির জন্য গরু বিক্রি বন্ধ করা এবং গোমাংস রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তার এ মন্তব্য ঘিরে ভারতজুড়ে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
চিস্তি বলেছেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে গরুর বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। সেই কারণে গরুকে যথাযথ সম্মান ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে গরুকে জাতীয় পশুর মর্যাদা দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়নের আবেদন জানান। তার ভাষায়, এ ধরনের বিষয়ে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তিনি দাবি করেন, মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশও এমন উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখবে।
ঈদুল আজহা সামনে রেখে গরু কুরবানি নিয়ে ভারতে প্রতি বছরই বিতর্ক দেখা যায়। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর প্রকাশ্যে গো-হত্যা নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে নতুন বিজেপি সরকার। এ প্রেক্ষাপটে আজমেঢ় শরিফের মতো প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চিস্তি শুধু গো-হত্যা বন্ধের দাবিই জানাননি, গবাদিপশুর প্রতি অবহেলার বিরুদ্ধেও কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক মানুষ গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করলে তাদের রাস্তায় ছেড়ে দেয়। ফলে এসব গরু প্লাস্টিক ও ময়লা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার মতে, এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বিজেপি সরকারের সমালোচনাও করেন। তার প্রশ্ন, কেন্দ্রের সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও কেন এখন পর্যন্ত গো-সুরক্ষা ও গবাদিপশুর সুরক্ষায় কার্যকর ও সর্বজনগ্রাহ্য আইন তৈরি করতে পারেনি।
উল্লেখ্য, ভারতে গত এক দশকে গো-রক্ষার নামে সহিংসতার বহু অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন রাজ্যে স্বঘোষিত গো-রক্ষক গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। গো-মাংস রাখার অভিযোগে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। পরে আরও কয়েকটি রাজ্যে গরুবাহী ট্রাক থামিয়ে হামলা, হেনস্তা ও গণপিটুনির অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের ঘটনার কারণে দেশের মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও চিস্তির বক্তব্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে এনেছে।
তিনি মনে করেন, যদি গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা ও গো-হত্যা বন্ধের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার হয়, তাহলে মুসলিম সমাজেরও তা গ্রহণে আপত্তি থাকবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা— এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে ভারতে গরু নিয়ে বিতর্ক বহুদিন ধরেই চলছে। আজমেঢ় শরিফের এ বক্তব্য সেই বিতর্কে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিল।