রাসুল (সা.) রমজান সম্পর্কে আমাদের শুধু কিছু বিধান দিয়ে যাননি; তিনি উম্মতকে শিখিয়ে গেছেন—এই মাসকে কিভাবে গ্রহণ করতে হয়, কিভাবে প্রস্তুত হতে হয় এবং কিভাবে আল্লাহর আরো কাছাকাছি যেতে হয়। তাই রমজান উপলক্ষে রাসুল (সা.)-এর বিশেষ উপদেশ জানা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
একে অপরকে স্বাগত জানানো : রমজান মাসের আগমনে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো ছিল নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ। তিনি রমজানের সূচনায় তাঁর সাহাবিদের সুসংবাদ দিতেন ও বলতেন, ‘তোমাদের কাছে এক মহিমান্বিত ও পবিত্র মাস উপস্থিত হয়েছে।এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এই মাসে এমন এক রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এই মাসের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে, সে প্রকৃত অর্থেই চরমভাবে বঞ্চিত।’ (আস সুনান ওয়াল আহকাম : ৪০০)রমজান মুমিনদের জন্য আনন্দ, রহমত ও বরকতের মাস।এ মাসে একজন মুমিন রোজা, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য আরো বেশি সচেষ্ট হয়।
অতএব, সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা একটি সুন্নত ও বরকতময় আমল। দ্রুত ইফতার করার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ হিকমত হলো, আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের) রোজা পালনের পদ্ধতি থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করা; কেননা তারা সাধারণত দেরিতে রোজা ভাঙে।
দেরিতে সাহরি খাওয়া : ফজরের আগে সাহরি গ্রহণ করাও রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। নবী (সা.) সাহরি দেরিতে খাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘আমার উম্মত তত দিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যত দিন তারা সাহরি দেরিতে গ্রহণ করবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘সাহরি খাও, কেননা সাহরিতেই আছে বরকত।’ (নাসায়ি, হাদিস : ২১৪৭)সাহরির বরকত ও উপকারিতা বহুমুখী। সাহরির খাবার রোজাদারকে দিনের বেলায় রোজা ও ইবাদত পালনের জন্য শক্তি জোগায় এবং ক্লান্তি দূর করে। যারা সাহরি গ্রহণ করে না, তাদের জন্য দীর্ঘ সময় রোজা রাখা অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে ওঠে। এ ছাড়া সাহরি মানুষকে রাতের শেষভাগে ঘুম থেকে জাগতে সহায়তা করে, যা তাহাজ্জুদ নামাজ, দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য একটি মূল্যবান সুযোগ তৈরি করে। সাহরি গ্রহণের ফলে জামাতে ফজরের নামাজ আদায়ের প্রতিও উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই রমজান মাসে ফজরের সময় মসজিদে ইবাদতকারীদের উপস্থিতি বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে থাকে।
খেজুর দিয়ে ইফতার করা : রোজাদারের জন্য ইফতার শুরু করার অন্যতম একটি সুন্নাহ হলো পাকা খেজুর বা তাজা খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা। খেজুর পাওয়া না গেলে পানি দিয়ে ইফতার করাও বাঞ্ছনীয়। এই উপদেশ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। যদি খেজুর না পায়, তবে পানি দিয়ে ইফতার করবে, কারণ পানি পবিত্র।’ (তবরানি, হাদিস : ৫৫১৭)
কারণ সারা দিন রোজা রাখার ফলে রোজাদারের রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়। খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি থাকায় তা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায় এবং রোজাদারের হারানো শক্তি পূরণ করে। আর পানি শরীরকে সতেজ করে ও পবিত্রতা বজায় রাখে।
রাতের নফল নামাজ আদায় করা : রমজান মাসে রাতের নামাজের (বিশেষভাবে তারাবির নামাজের) গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের নামাজ (বিশেষভাবে তারাবির নামাজ) আদায় করে, আল্লাহ তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০১৪)
নবীজি (সা.) উম্মতকে রমজানে রাতের নামাজে উৎসাহিত করেছেন, আর সাহাবায়ে কেরাম এ মাসে নিয়মিতভাবে রাতের নামাজ আদায় করতেন। রাতের নামাজ সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত আদায় করা যায়। যে ব্যক্তি রাতের নির্জনতায় আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়ায়, আল্লাহ তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন, যারা তাঁকে বেশি স্মরণ করে।
ইতিকাফ—রমজানের শেষ ১০ দিনের একান্ত ইবাদত : ইতিকাফ হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মসজিদে অবস্থান করা এবং নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ইবাদতে নিয়োজিত রাখা। সাধারণভাবে ইতিকাফ শুরু হয় রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পর থেকে এবং শেষ হয় রমজানের শেষ দিনের সূর্যাস্তে। ইতিকাফের সর্বোত্তম ও সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ সময় হলো রমজানের শেষ ১০ দিন। এর পেছনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। সর্বপ্রথম নবী করিম (সা.) নিজে এই সময়টিতে নিয়মিতভাবে ইতিকাফ পালন করতেন। এ বিষয়ে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘নবী (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে ইতিকাফ করতেন, যত দিন না আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া থেকে তুলে নেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৭২)
নবী (সা.)-এর এই আমল উম্মতকে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে ইতিকাফ পালনে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া রমজানের শেষ ১০ দিনের মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল কদর—এক মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই বরকতময় রাতের ফজিলত লাভের আশায় মুসলমানরা এ সময়ে তাদের ইবাদত আরো বৃদ্ধি করে, অধিক মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখে।