শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:

৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান: বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

 রাজনৈতিক তাৎপর্য, জিয়াউর রহমানের উত্থান এবং বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঘটনাবহুল ও বিতর্কিত দিন। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতীয় নেতৃত্বের সংকট দেশকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেই সংকটময় সময়ে সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে।

দিনটি কারও কাছে জাতীয় সংহতি ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক, কারও কাছে সামরিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, আবার কারও কাছে বিপ্লবের নামে নতুন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সূচনা। তাই ৭ নভেম্বরকে বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান বিশ্লেষণ করা জরুরি।

১. ১৯৭৫: অস্থিরতার সূচনা

১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির বছরগুলোর একটি। ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। এরপর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতা ও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এতে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয় এবং খালেদ মোশাররফ সামরিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে।

২. ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও ৭ নভেম্বরের পটপরিবর্তন

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বুঝতে হলে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের ভূমিকা বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। অন্যদিকে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এবং এর সামরিক সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে সংগঠিত হতে থাকে।

জাসদের নেতা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের সৈনিকদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য, পদমর্যাদাগত অসন্তোষ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করেন।

৬ নভেম্বর মধ্যরাত পেরিয়ে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিক বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহী সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। খালেদ মোশাররফসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান।

এই ঘটনাকে বিএনপি ও তার সমর্থকেরা সিপাহী-জনতার বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেন। তবে ঐতিহাসিক গবেষণায় এর পেছনে জাসদের সাংগঠনিক ভূমিকা, সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতার দ্বন্দ্বকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। A History of Bangladesh +2

৩. আবু তাহের, জাসদ ও বিপ্লবের ভিন্ন ব্যাখ্যা

৭ নভেম্বরের ইতিহাসে আবু তাহেরের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল প্রচলিত সামরিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সৈনিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। জাসদের বিপ্লবী চিন্তাধারায় রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল।

কিন্তু ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের রাজনৈতিক লক্ষ্য এক জায়গায় স্থির থাকেনি। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন। অন্যদিকে আবু তাহের বিপ্লবী পরিবর্তনের প্রত্যাশা অব্যাহত রাখেন।

পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়। ১৯৭৬ সালে সামরিক আদালতে বিচারের পর আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফলে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর রাজনৈতিক ফলাফল শেষ পর্যন্ত জাসদের প্রত্যাশিত পথে এগোয়নি। A History of Bangladesh +1

৪. জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ও রাষ্ট্র পরিচালনা

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্র হয়ে ওঠেন। তবে তিনি ওই দিনই রাষ্ট্রপতি হননি। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি জাতীয় উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার একটি রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে সামনে আসে।

৫. বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বিএনপির প্রতিষ্ঠা

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলেও পরবর্তী সামরিক আইন প্রশাসনের অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে সামনে আসে:

* বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।

* জাতীয় ঐক্য ও সংহতি।

* বহুদলীয় গণতন্ত্র।

* অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা।

* উৎপাদনমুখী অর্থনীতি।

* স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে সামরিক আইন প্রশাসন থেকে নির্বাচিত সংসদীয় রাজনীতিতে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়। State.gov +2

৬. ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বিতর্ক

৭ নভেম্বরের মূল্যায়নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

বিএনপির দৃষ্টিতে: দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। দলটির মতে, এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় সূচিত হয়।

জাসদের দৃষ্টিতে: এটি ছিল সৈনিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা। আবু তাহেরের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে: এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত এবং রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।

অতএব, ৭ নভেম্বরকে কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষমতায় উত্থান কিংবা একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার সূচনা হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না।

৭. ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ছিল অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দেশকে বহু কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

৭ নভেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একটি দেশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

ইতিহাসের কোনো ঘটনাকে মূল্যায়ন করতে হলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য, দলিল এবং নিরপেক্ষ গবেষণার আশ্রয় নিতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে অতিমানব কিংবা কোনো ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভুল বা সম্পূর্ণ নির্ভুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বিচার করাই ইতিহাসচর্চার দায়িত্ব।

উপসংহার

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই দিন জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ সুগম হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ এবং বহুদলীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি সমগ্র জাতির।

৭ নভেম্বর তাই শুধু অতীতের একটি দিন নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ

1. Willem van Schendel, A History of Bangladesh, Cambridge University Press। বইয়ের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

2. Martial Law in Bangladesh, 1975–1979, SOAS University of London। গবেষণামূলক থিসিস

3. United States Department of State — Bangladesh Historical Background। ঐতিহাসিক বিবরণ

4. Centre for Policy Dialogue (CPD) — Bangladesh Politics and Political Parties। গবেষণাপত্র

5. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণ। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাজনৈতিক দর্শন

লেখাটিতে বিএনপির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে পাঠক ঘটনাটির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা পান।

সংকলন ও উপস্থাপনা: সৈয়দ শহীদ হোসেন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102