ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ৬০টি নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে গতকাল সোমবার ভর্তি ছিলেন ১৮৭ জন। শয্যা না পেয়ে অনেকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই চিত্র রাজধানীর আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। এর মধ্যেই দেশে ডেঙ্গুতে এক দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রেকর্ড হয়েছে।
সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন। চলতি বছর এক দিনে এটাই সর্বোচ্চ হাসপাতালে ভর্তি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। অক্টোবরে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কীটতত্ত্ববিদরা।
ডেঙ্গুতে এ বছর মৃত্যু ১৫৭: চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৫৭ জন। ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩ হাজার ৫৭০ জন। শুধু সেপ্টেম্বরের ১৪ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৬০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া আটজনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের তিনজন, ঢাকা বিভাগের চারজন ও ময়মনসিংহ বিভাগের একজন।
গতকাল মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত শয্যাগুলোর পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতে রোগীদের চিকিৎসা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শয্যায় একাধিক রোগীকে রাখতে হচ্ছে। এতে রোগীদের পর্যবেক্ষণ, ওষুধ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত শয্যা, চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।
শয্যা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন রোগী ও স্বজনরা। রাজধানীর মাতুয়াইলের বাসিন্দা নুরজাহান বেগমের ২০ বছর বয়সী নাতনি জাহিন এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছেন। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন স্বজনরা। তিন-চারটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরে শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জাহিনকে। শয্যা না থাকায় মেঝেতেই চলছে তাঁর চিকিৎসা। নুরজাহান বলেন, অনেক হাসপাতালে ঘুরেছেন, কোথাও শয্যা পাননি।
ঢাকার বাইরেও বাড়ছে চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৭৩৩ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৩৮৮, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৩, খুলনা বিভাগে ৩০২, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫, রংপুর বিভাগে ৮৬ ও সিলেট বিভাগে সাতজন রয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৩ হাজার ৫৭০ জনের মধ্যে ৪৯ হাজার ৩৭৫ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ২৮২ জন। দেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছিল গত আগস্ট মাসে। ওই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬। আগস্টে মারা গেছেন ৪৩ জন। চলতি বছর ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির হার দ্রুত বাড়ছে। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক হাসপাতালে নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সমকালকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শয্যা বা সুযোগ-সুবিধার সংকট হলে প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। সক্ষমতা অনুযায়ী হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। শুধু রাজধানীতে নয়; ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকাগুলোতে উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য।
অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপের আশঙ্কা
অক্টোবরে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার। গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সেমিনারে তিনি বলেন, তাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এডিস মশা রাতেও কামড়ায়।
শীতে কিউলেক্স মশা বেশি দেখা গেলেও এডিস মশা তুলনামূলক কম চোখে পড়ে। এ কারণে মানুষ এডিস মশাকে অবহেলা করে। তাই মশার আচরণ সম্পর্কে মানুষকে জানতে হবে। বাংলাদেশকে ‘মশার দেশ’ উল্লেখ করে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, দেশের ঘাড়ে ডেঙ্গু চেপে বসেছে। দেশে ১২৬ প্রজাতির মশা আছে। এর মধ্যে সাত থেকে আট প্রজাতির মশার কলোনি রয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই সহজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো রোগ। এ রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা কঠিন।
‘শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে সাময়িকভাবে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ডেঙ্গুর মূল উৎস এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। ওই বছর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা দেখা যায়। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।