মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ন

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি টানানো নিয়ে বিতর্ক, প্রতিবাদ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি টানানো নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার ডাকসু সংগ্রহশালায় গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি টানায় ছাত্র ফেডারেশন। জিন্নাহর ছবিটি ছিঁড়ে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী। জিন্নাহর ছবি টানানোসহ একাধিক বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্রদলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

জিন্নাহর ছবি টানানোর প্রতিবাদে দুপুরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। এর কিছুক্ষণ পরই ডাকসুর সংগ্রহশালায় ফ্রেম ভেঙে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। আবু তৈয়ব বলেন, “কার্জন হলে ছাত্রছাত্রীদের সামনে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, বাংলা হবে না’ বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্রটা জিন্নাহ তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র তখন প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, জিন্নাহ সাহেব, আপনার এই সিদ্ধান্ত আমরা মানি না।”

আবু তৈয়ব বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মূল নায়ক হিসেবে পরিচিত প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। উনার নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল হয়েছিল। সেখানে অনেক ছাত্র গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, দুই হাজারের ওপরে। সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারেন না।’

গোলাম আযমের ছবি টানিয়ে প্রতিবাদ
গতকাল বিকেল ৩টায় ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী গোলাম আযমের ছবি টানায়। সংগ্রহশালায় গিয়ে দেখা যায়, যে স্থানে জিন্নাহর ছবি লাগানো হয়েছিল, তার ওপরে আশির দশকে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি লাগানো হয়েছে।

ছাত্র ফেডারেশনের নেতা অর্ক বড়ুয়া বলেন, ‘ইতিহাসকে একপক্ষীয়ভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না। আর গোলাম আযমরা একাত্তরে যা করেছেন, তার ফলে আশিতে তাঁকে মানুষ জুতাপেটা করেছে। আমরা এ দেশের আপামর মানুষ সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করেছি।’

ডাকসু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে: ছাত্রদল
প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশচন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘বিতর্কিত ডাকসু থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অধিকাংশ ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি তারা টানিয়েছে। আমরা এটা সহ্য করতে পারি না। এটা অপসারণ করা না হলে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিস এবং ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।’ জিন্নাহর ছবি সরানোর জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেয় ছাত্রদল।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (একাংশ) ঢাবি সংসদের সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা। আমাদের চাওয়া ছিল, মহান মুক্তিযু্দ্ধকে আওয়ামী দখলদারিত্ব এবং হেয় করা– এই দ্বিমুখী অপতৎপরতার বিপরীতে ডাকসু এ দেশের মানুষের প্রকৃত লড়াইয়ের ইতিহাস ছাত্র-জনতার কাছে তুলে ধরবে। ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; ডাকসু হবে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর। কিন্তু ডাকসু এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সামনে আনার পরিবর্তে মুছে দেওয়ার অপতৎপরতা চালাচ্ছে।’

‎বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফ বলেন, “ডাকসু লজ্জাজনকভাবে ইতিহাসকে বিকৃতি করেছে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছিল। রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ সেখানে ডাকসু জিন্নাহকে নায়ক হিসেবে উত্থাপন করেছে, তা ইতিহাস বিকৃতি। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একই সঙ্গে ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাসকে যেভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, তা ইতিহাসের বিকৃতি। এ ঘটনায় ডাকসুর নেতৃবৃন্দের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।”

তবে ছাত্র সংগঠনগুলোর অভিযোগ অস্বীকার করে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ সমকালকে বলেন, ‘আমরা জিন্নাহকে দায়মুক্তি দিইনি। জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, আমরা সেটাই তুলে ধরেছি। বরং যারা জিন্নাহর ছবি ছিঁড়েছে, তারাই মূলত জিন্নাহ-প্রেম দেখাচ্ছে।’ এ ছাড়া জিন্নাহর ছবি টানানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট।

ডাকসুর কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের আপত্তি
ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।

শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে অনুমোদন ছাড়া একটি ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষণ মূল্যায়ন নীতিমালা রয়েছে এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে পৃথক কোনো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর সুযোগ নেই।

সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্বেগ
ডাকসু সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ও দলিলের উপস্থাপন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটির অভিযোগ, মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি সংযোজন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু আলোকচিত্রের উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তারা ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিক ইতিহাস যথাযথ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতামত নিয়ে সংগ্রহশালার প্রদর্শনী সাজানোর দাবি জানিয়েছে।

এর আগে রোববার ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা এ সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায়। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। আরেকটি ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবি, যাতে জিন্নাহ রয়েছেন। ওই সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবিসংবলিত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল। অন্য ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবিসংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102