স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চালু হওয়া ‘জনতার বাজার–১’ এক বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে গেছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, বাজারটি নিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা জেলা প্রশাসন বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বাজারের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাজারটির উদ্যোক্তা ও কর্মীরা। একই সঙ্গে বাজারটিতে নিয়মিত কেনাকাটা করা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
২০২৫ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মোহাম্মদপুরে ‘জনতার বাজার–১’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাজার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তাকে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাঁদের বাজার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
শুরু থেকেই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে তা তুলনামূলক কম দামে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও ছিল বাজারটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্থানীয় মানুষের মধ্যে বাজারটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলক কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ায় নিয়মিত এই বাজারে কেনাকাটা করত।
তবে বাজার পরিচালনা নিয়ে একপর্যায়ে প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে বাজারটির কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে তাঁরা জানান।
এরপর উদ্যোক্তারা আদালতের শরণাপন্ন হন।
উদ্যোক্তাদের দাবি, আদালত তাঁদের পক্ষে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আদালতের ওই আদেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের লোকজন বাজারে এসে তাঁদের অনুপস্থিতিতে প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। এর ফলে বাজারটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
উদ্যোক্তা সানোয়ার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের অসহযোগিতা ও সমন্বয়হীনতার মধ্যেও তাঁরা বাজারটিকে একটি সেবামূলক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, বাজার পরিচালনার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, পণ্য সংগ্রহ, কর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তারা নিজেদের অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার পর বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, কৃষক ও ভোক্তারাও ক্ষতির মুখে পড়বেন।
আরেক উদ্যোক্তা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা শুধু লাভের জন্য বাজারটি গড়ে তুলিনি। স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে পণ্য নিশ্চিত করা এবং কৃষককে ন্যায্য মূল্য দেওয়াই ছিল আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। প্রশাসনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অসহযোগিতার মধ্যেও আমরা কার্যক্রম চালিয়ে গেছি।’
নিয়মিত ক্রেতাদের কয়েকজন জানান, আশপাশের অন্যান্য বাজারের তুলনায় ‘জনতার বাজার–১’-এ কিছু পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক পরিবার বাজারটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের এখন অন্য বাজারে যেতে হবে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যয় বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
একজন ক্রেতা বলেন, ‘স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য বাজারটি বেশ উপকারী ছিল। কোনো সমস্যা থাকলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। বাজার বন্ধ করে দিলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন সাধারণ ক্রেতারা।’
এদিকে এর আগে কামরাঙ্গীরচরে ‘জনতার বাজার–২’-এর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, সমন্বয়ের অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে বাজারটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেনি। সরকারি অর্থে তৈরি ওই বাজারের অবকাঠামো বর্তমানে অযত্ন ও অব্যবহারে পড়ে আছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, একই পরিণতি হতে পারে ‘জনতার বাজার–১’-এরও। তাঁদের মতে, বাজার পরিচালনায় কোনো অনিয়ম বা সমস্যা থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে পরিচালন কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা যেতে পারে। কিন্তু বাজারটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে কৃষক, উদ্যোক্তা, কর্মী ও ভোক্তা—সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে বাজার বন্ধের কারণ নিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের এডিসি ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘জনতার বাজার–১-এর সঙ্গে তাঁদের যে চুক্তি ছিল, তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আমরা সকালে তালা লাগিয়েছি।’
প্রশাসনের এই বক্তব্যের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের বক্তব্যের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজার নিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা অবস্থায় তালা লাগানো হয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাজারটি বন্ধ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় আদালতের স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা, চুক্তির মেয়াদ এবং বাজার বন্ধের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
‘জনতার বাজার–১’ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি করা। বাজারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে যে বিরোধই থাকুক না কেন, তার প্রভাব যেন সাধারণ ক্রেতা ও কৃষকের ওপর না পড়ে।
আদালতের আদেশ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি করে স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাজারব্যবস্থা চালু রাখার উদ্যোগ নেওয়া হোক।