শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২২ অপরাহ্ন

চাঁদের আলো আর কুপি বাতিতে পুঁথি পাঠের আসর

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

আকাশে শরতের পূর্ণিমার চাঁদ, নিচে গ্রামের উঠোনে মাদুর পেতে বসেছেন দর্শকরা। সামনে জলচৌকিতে বসেছেন একজন পাঠক।

হারিকেন আর কুপির বাতির আলোয় এক মায়াময় পরিবেশ। চারপাশে সুনসান নীরবতা। আলো-আঁধারীর মাঝে ভেসে আসে পুঁথি পাঠের সুর।
কয়েক দশক আগে হারিয়ে যাওয়া এমন দৃশ্যের দেখা মেলে চলনবিল বিধৌত পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া গ্রামে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে ওই গ্রামের প্রয়াত কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠোনে বসে গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য পুঁথি পাঠের আসর। শহরের কোলাহল ছেড়ে নিস্তব্ধ রাতে ধরা দেয় বাংলার মাটির আসল সৌন্দর্য। সময়টা যেন হঠাৎ ফিরে যায় আশির দশকে।
চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে চলনবিল পাড়ের এক নিভৃত পল্লী সোনাহারপাড়া গ্রাম।

 

চাটমোহর জারদিস মোড় থেকে মান্নানগর ভাঙাচোরা আর ধুলোবালির সড়ক পেরিয়ে গ্রামে ঢুকতে ইট বিছানো পথ। সেই পথ মাড়িয়ে আয়োজনস্থলে পৌঁছাতে রাত সাড়ে ৮টা। বাড়ির উঠোনে একপাশে খড়ের পালা, অপর পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। প্রচণ্ড ভাপসা গরমে ত্রাহি অবস্থা। তখন অনেকেই এসেছেন দেখতে। আয়োজকরা ব্যস্ত সব প্রস্তুত করতে। মাথার ওপর তখন চাঁদ আলো ছড়িয়েছে। কুপিবাতি আর হারিকেন জ্বলছে।
রাত সোয়া ৯টা থেকে শুরু হয়ে পুঁথি পাঠের আসর চলে রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত। তার আগে উঠোনে পাতা মাদুরে বাড়তে থাকে গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ তরুণী দর্শকের সংখ্যা। একসময় দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায় আসর। শুধু চাটমোহর উপজেলার নয়, ঢাকা থেকেও আসেন সংস্কৃতিপ্রেমী কয়েকজন।

 

বিপ্লব আচার্যের সঞ্চালনায় শুরুতে পুঁথি পাঠের আসরের মুখবন্ধ পাঠ করেন আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক। এরপর শুরু হয় পুঁথি পাঠ। আসরে বিবি সোনাভান পুঁথি পাঠ করবেন নব্বইয়ের দশকের নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল। গাজী কালু ও চম্পাবতী পুঁথি পাঠ করবেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। শেষে তাদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন আয়োজকরা।

পুঁথি পাঠের গায়েন তার মায়াবি সুরের জাদুতে মাতিয়ে তোলেন দর্শক শ্রোতাদের। জোসনা রাতে মুগ্ধতায় ভাসেন সবাই। ছোটবেলায় দাদা-দাদির মুখে গল্প শোনা পুঁথি পাঠের আসর স্বচক্ষে দেখে আপ্লুত দর্শক শ্রোতারা। এ যেন শেকড়েরর সুরে ফিরে যাওয়া।

 

পুঁথি পাঠ শুনতে এসেছিলেন সত্তোর্ধ কৃষক হাসান প্রামাণিক। তিনি বলেন, ৪০ বছর আগে শুনেছিলাম। তখন মুরব্বিরা আয়োজন করতো। ভালোই লাগত। আমরা কৃষিকাজ করতাম। অবসরে আসরে বসে পুঁথি পাঠ শুনতাম। এত বছর পর আয়োজনটা ভালোই লাগল। ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক। তার ভাষ্য, ছোটবেলায় যখন আমি স্কুলে পড়তাম, তখন নানা বাড়িতে বৈঠকখানাতে এই রকম পুঁথি পাঠের আসর বসত। এত বছর পর পুঁথি পাঠ দেখে শুনে সেই ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। এখন তো মোবাইলে ডুবে গেছি আমরা। আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে ধরে রাখা দরকার।

ফয়সাল মাহমুদ সদ্য নামের এক তরুণ বলেন, ‘আসলে পুঁথি পাঠ কি আমি জানতাম না। ফেসবুকে আয়োজনের প্রস্তুতি দেখে ডা. আতিককে ফোন করে জেনেছি। আগে কখনও দেখিনি। তাই আব্বুর সাথে পুঁথি পাঠ দেখতে এসে খুব ভাল লাগলো।’

 

চাটমোহর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন বলেন, ‘যখন সারা পৃথিবী এ আই প্রযুক্তিতে ডুবে আছি, সেখানে এই পুঁথি পাঠের আসর আয়োজন একটি বিরল ঘটনা। কারণ শত শত বছরের ঐতিহ্য আমরা ধীওে ধীওে হারিয়ে ফেলছি। আমাদের পরিচিত হলো আদি সংস্কৃতি। তারই অংশ পুঁথি পাঠ। এটাকে ধরে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।’

পুঁথি পাঠ করতে পেরে আবেগ আপ্লুত নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল। তিনি বলেন, ‘আগে যখন গ্রামে পুঁথি পাঠ শুনতাম তখন থেকেই সুরটা আমার মধ্যে ছিল। আমি পাঠক না হলেও আজ প্রথম পাঠ করলাম। এতে আমার মনে হলো, মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ তৈরী ও পাশাপাশি আনতে পুঁধিপাঠের মতো গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখতে হবে। এখনকার গল্প দিয়ে যদি পুঁথি বাধা যায় তাহলে মানুষকে সুন্দর পথের স্বপ্ন দেখানো সম্ভব।

 

আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্যবাহি বর্ণালী একটা সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। তার অন্যতম হলো পুঁথি পাঠ। সেই ষোলশ’ সতেরোশ’ শতকের। আশি-নব্বই সাল পর্যন্ত নিভু নিভু করে জ্বলেছে। বর্তমানে একদমই বিলুপ্ত প্রায় একটি সংস্কৃতি। অনেকে জানেই না এই পুঁথি পাঠ টা আসলে কি। আমরা ফিরে যেতে চেয়েছি সেই সময়টায়, দেখতে চেয়েছি কেমন ছিল পুঁথি পাঠের আসর। মুলত সেই হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে এই আয়োজন।’

 

পুঁথি পাঠের আসরের আয়োজনের খবর জানতে পেওে ঢাকা থেকে দেখতে এসেছিলেন পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশল রিপন নাথ। তার ভাষ্য, খুবই ভাল একটি আয়োজন। নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এখন যদি পুঁথি পাঠ টাকে জনপ্রিয় ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চান তাহলে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন করে গল্প তৈরী করতে হবে। যাতে মানুষের শোনার আগ্রহ বাড়ে। তাহলে এটাকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস, পুঁথি পাঠ, হাটুরে কবিতা, ছিল গ্রামীণ জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ভিন্ন সংস্কৃতি চর্চা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন বিলুপ্ত প্রায়। লোকজ এই ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখতে সরকারের পদক্ষেপ দাবি সংশ্লিষ্টদের।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102