রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত ১৬ দেশের কূটনৈতিক মিশন যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়।
একই সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে কূটনৈতিক মিশনগুলো।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে কানাডা, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কসোভো, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক মিশনগুলো সই করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির পর নয় বছর পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে কঠিন পরিস্থিতিতে বসবাস করছেন।
দীর্ঘ সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রোহিঙ্গাদের সহনশীলতা, সাহস ও মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছে মিশনগুলো। একই সঙ্গে বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে প্রায় এক দশক ধরে মানবিক আশ্রয় ও সহায়তা দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের উদারতার প্রশংসা করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যজুড়ে চলমান সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সেখানে মানবিক চাহিদাও চরম আকার ধারণ করেছে।
ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা, বেসামরিক অবকাঠামোয় বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ত্রাণ ও বাণিজ্যের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন করে অনেক মানুষ বাংলাদেশসহ আশপাশের অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পালানোর সময় বহু রোহিঙ্গার প্রাণহানিও ঘটছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক মিশনগুলো।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি, কৌশলগত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে তারা।
এ জন্য বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ দূর করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গিয়ে যাতে নিজেদের বাড়িঘর, জীবিকা ও সামাজিক জীবন পুনর্গঠন করতে পারে, সে জন্য তাদের শিক্ষা ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সহায়তা বিতরণ ব্যবস্থার মান উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় বাংলাদেশি নেতৃত্ব ও রোহিঙ্গাদের নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে মিশনগুলো বলেছে, রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট দশম বছরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের কথা ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের অধিকার ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে ১৬ কূটনৈতিক মিশন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে তারা।
google newsকালের কণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন