কুমিল্লায় চাষ হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দামি মরিচ ‘চারাপিতা’। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা এ মরিচের প্রতি কেজির দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৬ লাখ টাকা। কুমিল্লায় অবশ্য এখনো বাণিজ্যিকভাবে নয় শখের বসে কয়েকজন কৃষক এ মরিচ চাষ করছেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারীও রয়েছেন।
কুমিল্লা মহানগরীর দেশওয়ালিপট্টির বাসিন্দা কাজী শারমিন আক্তার তাঁদের একজন।
প্রবাসী মো. ইকবাল মজুমদারের স্ত্রী শারমিন বাড়ির আঙিনা ও বালতিতে ছয়টি চারাপিতা মরিচগাছ লাগিয়েছেন। অস্বাভাবিক গোলাকার আকৃতি ও সুগন্ধের কারণে তাঁর বাড়িতে এ মরিচ দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির ছোট সবজিবাগানে বেড়ে উঠেছে চারাপিতা মরিচগাছ। কাঁচা অবস্থায় মরিচগুলো সবুজ।
পাকতে শুরু করলে প্রথমে হলুদ এবং পরে গাঢ় লাল রং ধারণ করে। গাছের চারপাশে ছড়াচ্ছে সুগন্ধ। শারমিনের সঙ্গে তাঁর ছোট ছেলে আশ্রাফুল আমিন সাফিকেও গাছের পরিচর্যা করতে দেখা যায়।
শারমিন আক্তার বলেন, ২০২৩ সালে কুমিল্লার শৌখিন কৃষক আহমেদ জামিল সেলিমের বাগানের একটি ভিডিওতে চারাপিতা মরিচ দেখে তাঁর চাষ করার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পাকা চারটি মরিচ সংগ্রহ করেন।
প্রতিটি মরিচে ১৫ থেকে ২০টি বীজ থাকলেও প্রথম দফায় মাত্র তিনটি বীজ থেকে চারা গজায়। প্রথমবারে গাছে ভালো ফলন পান তিনি। পরে সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করে চাষ বাড়ান।
নিজের বাগানে উৎপাদিত মরিচ ও চারা আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীসহ কুমিল্লা নগরীর শতাধিক মানুষকে উপহার দিয়েছেন শারমিন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুসহ অনেকে তাঁর কাছ থেকে এ মরিচের চারা পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি সামান্য দামে বীজ ও চারা বিক্রি করছেন। তাঁর প্রত্যাশা, দুর্লভ এ মরিচ কুমিল্লাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।
শারমিন বলেন, রান্নায় চারাপিতা মরিচ ব্যবহার করলে খাবারে সুগন্ধ আসে এবং স্বাদ বাড়ে। এ মরিচের স্বাদও অন্য মরিচের চেয়ে আলাদা।
কুমিল্লা নগরীর রানীর দিঘির পাড়ের বাসিন্দা শান্তা আক্তার সোনিয়া ও আদর্শ সদর উপজেলার সাতরা এলাকার সাদিয়াও চারাপিতা মরিচ চাষ করছেন। তাঁরাও শখের বসে এ মরিচ চাষ করছেন। তবে দেশে এ মরিচের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা যাচাই করে কৃষকদের সহযোগিতায় কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন শারমিন।
কুমিল্লায় চারাপিতা মরিচ চাষের শুরু ২০২২ সালে। নগরীর ঠাকুরপাড়ার বাগানবাড়িতে প্রথম এ মরিচ চাষ করেন কৃষক আহমেদ জামিল সেলিম। তিনি জানান, ২০১৭ সালে ইন্টারনেটে চারাপিতা মরিচ সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে পেরু থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। তিন দফা বীজ বপন করেও সফল হননি। চতুর্থ দফায় ৫০টি বীজ বপন করে একটি চারা পান। পরের বছর পাঁচটি গাছ দিয়ে চাষ শুরু করেন। একটি গাছ থেকে প্রায় তিন বছর পর্যন্ত মরিচ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
জামিল সেলিম বলেন, চারাপিতা বিশ্বের সবচেয়ে দামি মরিচগুলোর একটি। প্রতি কেজির দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। দেশে এ মরিচের বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকরা ভালো আয় করতে পারবেন। এ জন্য কৃষি বিভাগকে গবেষণা করে দেখতে হবে, বাংলাদেশের কৃষক পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে এ মরিচ চাষের সুযোগ রয়েছে কি না।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কুমিল্লা সরেজমিন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, কুমিল্লায় সর্বপ্রথম জামিল সেলিম চারাপিতা মরিচের চাষ শুরু করেন। আন্তর্জাতিক গবেষণায় এটিকে দুর্লভ মরিচ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া এ মরিচ চাষের জন্য কতটা উপযোগী সেটি গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন।