চোখের নিচে কালচে দাগ বা ডার্ক সার্কেল অনেকেরই নিয়মিত সৌন্দর্য নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যস্ত জীবন, অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, মানসিক চাপ কিংবা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের নিচের ত্বকে এই কালচে ভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অনেকে প্রসাধনী দিয়ে সাময়িকভাবে দাগ ঢেকে রাখেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে চোখের নিচের কালচে ভাব কমাতে হলে শুধু প্রসাধনীর ওপর নির্ভর না করে জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি।
পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দিন
চোখের নিচে কালো দাগের অন্যতম পরিচিত কারণ ঘুমের ঘাটতি। নিয়মিত কম ঘুম হলে চোখের নিচের ত্বক ফ্যাকাশে দেখাতে পারে এবং সেখানে থাকা রক্তনালিগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হয়ে কালচে ভাব তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস করা জরুরি। ঘুমানোর আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টেলিভিশন ব্যবহার কমিয়ে দিলে ঘুমের মানও ভালো হতে পারে।
রাত জাগার অভ্যাস কমাতে হবে
শুধু কম ঘুম নয়, নিয়মিত রাত জাগার অভ্যাসও চোখের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। রাত জেগে কাজ করা, দীর্ঘ সময় ওয়েব সিরিজ দেখা কিংবা ঘুমানোর আগ পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করলে চোখের বিশ্রামের সময় কমে যায়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে চোখের ক্লান্তি এবং চোখের নিচের কালচে ভাবেও পড়তে পারে। তাই সম্ভব হলে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
স্ক্রিন থেকে চোখকে বিরতি দিন
কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহার করতে হলে মাঝেমধ্যে চোখকে বিশ্রাম দেওয়া দরকার। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুষ্ক ও ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। কাজের ফাঁকে কিছুক্ষণ দূরে তাকানো, চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে রাখা চোখের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের সঙ্গে ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা ও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব যুক্ত হতে পারে, যা চোখের নিচের কালচে ভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে। তাই কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও বিশ্রাম, হাঁটাহাঁটি, পছন্দের কাজ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যকর উপায়ে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা ভালো।
পানি ও খাবারের দিকেও নজর দিতে হবে
শরীরে পানির ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক ও ক্লান্ত দেখাতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি রাখাও জরুরি। আয়রন, ভিটামিনসহ কিছু পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও ত্বক ফ্যাকাশে বা ক্লান্ত দেখাতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে চোখের নিচে কালচে ভাব থাকলে শুধু বাহ্যিক যত্ন না নিয়ে খাবারের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ঠান্ডা সেঁক দিতে পারেন
চোখের নিচে ফোলা বা ক্লান্ত ভাব থাকলে ঠান্ডা সেঁক সাময়িকভাবে আরাম দিতে পারে। পরিষ্কার কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা প্যাক কয়েক মিনিট চোখের নিচে ধরে রাখা যেতে পারে। এতে চোখের চারপাশের ফোলাভাব কিছুটা কমতে পারে এবং ত্বক সতেজ দেখাতে পারে। তবে বরফ সরাসরি ত্বকে লাগানো উচিত নয়।
শসা ব্যবহার করতে পারেন
চোখের ওপর ঠান্ডা শসার টুকরো রাখার প্রচলন অনেক পুরোনো। শসায় পানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় ঠান্ডা শসা চোখের চারপাশে কিছুটা প্রশান্তি দিতে পারে এবং সাময়িক ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। পরিষ্কার শসার টুকরো কয়েক মিনিট চোখের ওপর রেখে পরে পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে পারেন।
চোখের নিচের ত্বকে আলতোভাবে যত্ন নিন
চোখের নিচের ত্বক মুখের অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি পাতলা ও সংবেদনশীল। তাই সেখানে জোরে ঘষাঘষি বা বারবার টানাটানি করা ঠিক নয়। মেকআপ তোলার সময়ও আলতোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। চোখের চারপাশের সংবেদনশীল ত্বকের জন্য উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। দিনে বাইরে বের হলে চোখের চারপাশে সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা ভালো।
সব ডার্ক সার্কেলের কারণ এক নয়
জীবনযাপনের কারণে চোখের নিচে কালচে ভাব দেখা দিলেও সব ক্ষেত্রে ঘুম বা ক্লান্তিই একমাত্র কারণ নয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, অ্যালার্জি, চোখ ঘষার অভ্যাস, ত্বকের রঙের পরিবর্তন কিংবা চোখের নিচের ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়ার কারণেও ডার্ক সার্কেল হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন যত্ন নেওয়ার পরও যদি কালচে ভাব একই থাকে, তাহলে এর কারণ বুঝতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
চোখের নিচের কালো দাগ একদিনে তৈরি হয় না, তাই এক-দুই দিন কোনো ঘরোয়া উপায় ব্যবহার করলেই তা পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে, এমনটা আশা করা ঠিক নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত ত্বকের যত্ন—সবকিছু মিলিয়েই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর ডার্ক সার্কেল যদি হঠাৎ বাড়তে থাকে, এক চোখে বেশি দেখা দেয় বা ফোলা, ব্যথা কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গের সঙ্গে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।