সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৫৪ অপরাহ্ন

ঘর থেকে সাইবার দুনিয়া সবখানেই নিরাপত্তাহীন

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

একটি ব্যক্তিগত ছবি। কয়েকটি বার্তা। কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি একটি ভুয়া ভিডিও বা ছবি। কখনও কখনও এতটুকুই একটি নারীর স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

একসময় নারী নির্যাতন বলতে মারধর, যৌতুক, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতাকে বেশি বোঝানো হতো। সেই সহিংসতা এখনও আছে। তবে প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে বদলেছে নির্যাতনের ধরন ও পরিসর। মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যম এখন নারীর বিরুদ্ধে হয়রানি, ভয় দেখানো ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

ফলে নারী নিরাপত্তার পুরোনো সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা। ঘরের চার দেয়াল কিংবা পথঘাটের অনিরাপত্তার পাশাপাশি এখন ভয়ের কারণ হয়ে উঠছে সাইবার দুনিয়া। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ঘটনা বাস্তব জীবনেও তৈরি করছে সামাজিক চাপ, মানসিক সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি।

এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার সারা দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল। সেই ঘটনার ৩১ বছর পর নারী নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন বাস্তবতায় সামনে এসেছে।

সহিংসতার চিত্র এখনও ভয়াবহ

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে ১ হাজার ৬৬৭ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫৮ নারী ও ৮৩ কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২৯২ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এটি জাতীয় জরিপ নয়। সংবাদে না আসা ঘটনা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের পর্যবেক্ষণে নারীদের বিরুদ্ধে ৪০০টি ধর্ষণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন। শুধু জুলাই মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১ নারী। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের বয়স ১৮ বছর বা এর কম। দুই সংগঠনের পর্যবেক্ষণই বলছে, নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও ব্যাপক। আর এর ধরনও বদলাচ্ছে।

এ ছাড়া পুলিশের মে, জুন ও জুলাই ২০২৬-এর অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ১ হাজার ৯৫২টি। জুনে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০০। জুলাইয়ে আরও বেড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয় ২ হাজার ৩৩৬টি। অর্থাৎ মে থেকে জুলাই– মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এ ধরনের মামলা বেড়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর জুনের তুলনায় জুলাইয়ে মামলা বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ।

ঘরেও নিরাপদ নন

দেশের নারী সমাজ এখন নিজ ঘর ও পরিচিত পরিসরেই সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে দেশের আটটি বিভাগের ১৫ বছর ও এর বেশি বয়সী ২৭ হাজার ৪৭৬ নারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপের পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশিত হয়েছে।
এতে দেখা গেছে, ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ– অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই নারীর একজন গত এক বছরে স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর মাধ্যমে সহিংসতা কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।

অনলাইনে নির্যাতন

প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে নারীর ওপর সহিংসতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের জরিপে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার কয়েকটি ধরন অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়া নারীদের মধ্যে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন যোগাযোগ, যৌন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিওভিত্তিক হয়রানি কিংবা প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গত এক বছরে এ হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার সব ধরন এই জরিপে পরিমাপ করা হয়নি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া বা যৌনকৃত ছবি-ভিডিও কতটা ছড়িয়েছে, তার নির্দিষ্ট জাতীয় হিসাব নেই।

নীরব থাকেন বেশির ভাগ নারী

সহিংসতার শিকার হয়েও অধিকাংশ নারী তা প্রকাশ করেন না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের জরিপে দেখা গেছে, স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকা নারীদের প্রায় ৬৪ শতাংশ তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানাননি।

পারিবারিক সম্মানহানির ভয়, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা, নির্যাতনকারীকে ভয়, বিচ্ছেদ বা আরও বেশি সহিংসতার আশঙ্কা এবং ঘটনাটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা নারীদের নীরব রাখে।

তথ্যের ঘাটতিও নারীদের পিছিয়ে রাখছে। কোথায় সহিংসতার অভিযোগ করতে হয়, তা জানেন মাত্র ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ জাতীয় সহায়তা নম্বর ১০৯ সম্পর্কে জানেন মাত্র ১২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী।

আইন আছে, দরকার প্রয়োগ

নারী ও শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় চলতি বছর আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ গত ১০ এপ্রিল গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তবে আইন থাকলেই নির্যাতন বন্ধ হয় না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফাওজিয়া মোসলেম সমকালকে বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে ডিজিটাল সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, সহজলভ্য অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা, পুলিশ ও বিচারসংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য আইনি, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। নারীর প্রতি সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে না দেখে সামাজিক অপরাধ হিসেবে প্রতিরোধ করতে হবে। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102