চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর চার দিন পর পুলিশ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন। সোমবার সীতাকুণ্ড থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। নিহতের স্বজনরা কেউ মামলা না করাতে পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেছেন বলে জানিয়েছেন থানার ওসি।
এদিকে এ দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি ঘটনার তিন দিন পর দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের ভেতরে গিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। সোমবার বিকেলে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিএসবিআরএ গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন।
তদন্ত দলের সঙ্গে ঢাকা থেকে আসা বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ ও নৌ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও তদন্ত দলের সঙ্গে ঘটনাস্থলে গেছেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত টিমের প্রধান ও এ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত টিম রোববার সকাল থেকে ইয়ার্ডে এসে তদন্তে শুরু করেছে। জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকারে থাকে পানি। ওখানে বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাপ খুবই বেশি।
তিনি জানান, মঙ্গলবার প্রান্তিক ও আলিফ নামে দুই প্রতিষ্ঠানের উদ্ধারকারী টিম গ্যাসের পরিমাণ নির্ণয় করার পর কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তা বিস্তারিত বলা যাবে। তবে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংকে (জলাধার) বিপজ্জনক মাত্রায় গ্যাস জমে ছিল। সেখান থেকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কারো গাফিলতি ছিল কি না, এখানে সেফটি মেজারে কোনো ত্রুটি ছিল কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যে শিপটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আরও কোনো টক্সিক গ্যাস থেকে যেতে পারে। এটা যাতে নিরাপদ করে তোলা যায় সেই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত টিম কাজ করছে।’
ঘটনাস্থলে তদন্তে যুক্ত এইচআর শিপ ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা সোমবার সকাল থেকে জাহাজটিতে তদন্ত শুরু করেছি। তিন কমিটির সদস্যরা বিকেল ২টা ৪০ মিনিটে ঘটনাস্থলে আছেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে আমরা জাহাজটির একেবারে ওপরের অংশ পর্যন্ত গিয়েছি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা যাবে না।’
এর আগে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও জাহাজের ভেতরে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকির কারণে কোনো কমিটির সদস্যই দুর্ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি।
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ দলসহ অন্যান্য তদন্ত কমিটির সদস্যরা সোমবার সকাল থেকে ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড পরিদর্শন করেছেন। জাহাজে কোনো বিষাক্ত গ্যাস রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথমে বিশেষজ্ঞ দলে তিনজন সদস্য ছিলেন। আজ আরও চারজনকে যুক্ত করা হয়েছে। নতুন সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন, বিএসবিআরএ’র ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান ও শিপিং বিভাগের আরাফাত।
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির বিভিন্ন চেম্বারে এখনো বিষাক্ত গ্যাস থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন সালফাইডের তীব্রতা ও বিষক্রিয়ার ঝুঁকির কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তদন্তকারীদের জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
শিল্প মন্ত্রণালয় বুয়েটের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খানের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে। দলটিকে জাহাজের বিভিন্ন চেম্বারে থাকা গ্যাসের প্রকৃতি, পরিমাণ, লিকেজের উৎস এবং দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে সহায়তা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকে বিশেষজ্ঞ দলটিও কাজ শুরু করেছে।
তদন্ত দলের সঙ্গে থাকা কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থলের বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করছেন। জাহাজের কোন অংশ থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল, গ্যাসের উৎস কোথায় এবং দুর্ঘটনার সময় জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি কেমন ছিল এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাহাজের ভেতরে অন্য কোনো বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাস রয়েছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, সোমবার জাহাজে ব্যালাস্ট ট্যাংকারে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে থানায় একটি ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ থানায় মামলা করতে না আসাতে পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন। ফরেনসিক রিপোর্ট ও তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
গত শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে ভাটিয়ারীর স্টেশন রোড এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর আহত কয়েকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।