সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ শনিবার। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদার দম্পতির তৃতীয় সন্তান খালেদা জিয়া। আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিকের মৃত্যুর পর এটাই প্রথম জন্মদিন।
তবে আগের কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও জন্মদিন ঘিরে বড় কোনো আয়োজন থাকছে না। খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় ঢাকাসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল করবে বিএনপি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ বেলা ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি খালেদা জিয়ার তৃতীয় জন্মদিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট স্থায়ী মুক্তি পান তিনি। একসময় বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ১৫ আগস্ট কেক কেটে খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করতেন। তবে ২০১৬ সাল থেকে দলীয়ভাবে আর কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি না দিয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল করে আসছে বিএনপি।Language Resources
আরও পড়ুন: গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন চায় জামায়াত
দীর্ঘদিন নানা রোগে ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। কয়েক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মারা যান তিনি। পরদিন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাজায় কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হওয়ার পর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন গৃহবধূ খালেদা জিয়া। দলের নেতাকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন তিনি। পরে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পান।
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে তিন দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া। এ ছাড়া দুবার সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি সার্কের প্রথম নারী চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
ওয়ান-ইলেভেনের পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন তিনি। ওই সময় কারাগারেই জন্মদিন কাটাতে হয় তাকে। কারাবন্দি অবস্থায়ও তার অনড় অবস্থানের কারণে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ থেকে সরে এসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার।
আরও পড়ুন: পশ্চিম জার্মানিতে ভয়াবহ দাবানল, নিরাপদে বাংলাদেশিরা
দলীয় প্রধান হিসেবে বিভিন্ন সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও নির্বাচনে শতভাগ সফল ছিলেন খালেদা জিয়া। পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই জয় পান তিনি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে প্রতিবার পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে সবকটিতে বিজয়ী হন। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতেই জয় পান।
তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় সরকার গঠন করতে পারেনি। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দুর্নীতির দুই মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি পান তিনি। শর্ত ছিল, তিনি নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।
সাময়িক মুক্তির পরও গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় অনেকটা কারাবন্দি অবস্থায় ছিলেন খালেদা জিয়া। অসুস্থতার কারণে এ সময় তাকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল পরিবার। তবে সাময়িক মুক্তির শর্তের কথা উল্লেখ করে প্রতিবারই সেই আবেদন নাকচ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একে একে বিরোধী দলের নেতারা কারামুক্ত হন। তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়ে দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তার বড় ছেলে তারেক রহমান। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।Death & Tragedy
জন্মদিনের কর্মসূচি
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আজ শনিবার খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকাসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিকে শিগগিরই মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার হুমকি ট্রাম্পের
ঢাকায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বেলা ১১টায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হবে। এতে দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন। একই সঙ্গে বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দেশব্যাপী আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জন্মদিন উপলক্ষে আজ বিকেলে ঢাকা-১৭ আসনের মহাখালী কড়াইল বস্তি এলাকার টিঅ্যান্ডটি মাঠে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে অনুদান বিতরণ ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিবগঞ্জে দোয়া মাহফিল
খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে বগুড়ার শিবগঞ্জে গতকাল দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির তিন দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়াবালা গরীবপুর গ্রামের বায়তুল মামুর জামে মসজিদে এ আয়োজন করা হয়।
উপজেলা যুবদলের সভাপতি খালিদ হাসান আরমানের আয়োজনে বাদ জুমা অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলের আগে স্থানীয় মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম তাজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল ওহাব, সাংগঠনিক সম্পাদক মাস্টার হারুনুর রশিদ, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের, জেড এম মতিন, আব্দুল হান্নান, ফজলুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রায়হানুল হক রনি, ছামিউল ইসলাম আক্কাস, পৌর যুবদলের সভাপতি আবু শাহীন, মাহাদী হাসান তমাল, আতিকুর রহমান সুজন, উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মীর মুইনমুর রহমান মুন, পৌর ছাত্রদলের সভাপতি আল-আমিনসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।