বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন

নোবেল যদি ম্যান্ডেলার গণতন্ত্রের স্বীকৃতি হয়, খালেদা জিয়া’র কেন নন?

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের জন্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে।

তাঁকে কেউ ‘গণতন্ত্রের মাতা’ হিসেবে অভিহিত করেন, কেউ ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে চেনেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে যেমন প্রবল সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র সমালোচনা ও মতপার্থক্য। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এসব ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

বরং সময় এসেছে দলীয় আবেগ ও রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে ইতিহাসের বৃহত্তর পরিসরে মূল্যায়ন করার।

আমার কাছে প্রশ্নটি হলো—গণতন্ত্রের জন্য একজন রাজনৈতিক নেতার দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি সেই অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথাও ভাবা উচিত?
এই প্রশ্ন থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রসঙ্গ সামনে আসে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী অ্যাপারথেইড ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা ও এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।

বাংলাদেশের ইতিহাস আর দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস এক নয়। ম্যান্ডেলার সংগ্রাম ছিল অ্যাপারথেইডের বিরুদ্ধে, আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই তাঁদের সরাসরি একই পাল্লায় মাপা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না।
কিন্তু একটি জায়গায় প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম কি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয় হতে পারে না?

অবশ্যই পারে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯৯০ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক পরিণতি ঘটে। এরপর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় এবং দেশ নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে ফিরে যায়।

এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কিন্তু এখানেই তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন শেষ করা যাবে না।

১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ধারায় ফিরে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

একজন রাজনৈতিক নেতার ইতিহাস মূল্যায়ন করতে গেলে তিনি কীভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, তার পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে কোন দিকে নিয়ে গেছেন, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
এই জায়গায় খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল দৃঢ় অবস্থান। সেই অবস্থানকে কেউ রাজনৈতিক দৃঢ়তা হিসেবে দেখেছেন, কেউ অনমনীয়তা হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে কোনো নেতার রাজনৈতিক অবস্থানকে শুধু পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে বিচার করলে সেই ইতিহাস কখনো পূর্ণাঙ্গ হয় না।

খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তিনি বহুবার রাজনৈতিক ক্ষমতায় ছিলেন। আবার দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরেও ছিলেন। তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সরকার পরিচালনা করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং নানা সংকটের মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন।

একজন নারী হিসেবে বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়া এবং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠাও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে খালেদা জিয়ার মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু প্রশংসার কথাই বলা উচিত নয়। তাঁর শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত, বিরোধী দলের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্ব, হরতাল, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এবং বিভিন্ন অভিযোগ—এসবও ইতিহাসের অংশ। একজন ইতিহাসসচেতন মানুষ হিসেবে এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য—একজন নেতার রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক থাকলেই তাঁর ইতিবাচক ভূমিকা ইতিহাস থেকে মুছে যায় না।

ইতিহাস কাউকে দেবতা বানায় না, আবার কাউকে সম্পূর্ণ অন্ধকারেও ঠেলে দেয় না। ইতিহাস সময়ের ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি রেখে বিচার করে।
সেই বিচারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এখন আসি নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রসঙ্গে।
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—যদি নেলসন ম্যান্ডেলাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা যায়, তাহলে খালেদা জিয়াকে কেন নয়?

প্রশ্নটি আবেগের জায়গা থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবতার জায়গা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

নোবেল ফাউন্ডেশনের বর্তমান বিধি অনুযায়ী সাধারণ নিয়মে কোনো ব্যক্তিকে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন করে নোবেল পুরস্কার দেওয়া যায় না। অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে মরণোত্তর নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি বর্তমান নোবেল বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কিন্তু তাই বলে কি তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি শেষ হয়ে যায়?

আমি তা মনে করি না।

বরং এখানেই আমাদের চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য আরও বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার রয়েছে।

তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাবে না কেন?

কেন তাঁর নামে একটি আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পুরস্কার প্রতিষ্ঠিত হবে না?

কেন আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে না?

কেন বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণতন্ত্রবিষয়ক সংগঠনগুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা করবে না?

আমার কাছে মনে হয়, এই প্রশ্নগুলো এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে।

কারণ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু বিএনপির বিষয় নয়। ১৯৯০-এর গণআন্দোলন কোনো একক দলের আন্দোলন ছিল না। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।

সেই আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ।

তাই তাঁর অবদানকে দলীয় সম্পত্তি হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের অবদানও ইতিহাসে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত। কারণ একটি জাতির গণতান্ত্রিক ইতিহাস কখনো একজন মানুষের হাতে তৈরি হয় না।

কিন্তু এই সত্যও অস্বীকার করা যায় না যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শেষ করে দেয় না।

বরং অনেক সময় মৃত্যুর পর একজন নেতার রাজনৈতিক জীবনকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়।

জীবদ্দশায় দলীয় রাজনীতি, রাজনৈতিক সংঘাত এবং আবেগ একজন নেতার মূল্যায়নকে প্রভাবিত করে। কিন্তু সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে ইতিহাসের বিচার অনেক বেশি নির্মোহ হতে পারে।

খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও এখন সেই নির্মোহ মূল্যায়নের প্রয়োজন।

তাঁর সাফল্য যেমন লিখতে হবে, তেমনি ব্যর্থতাও লিখতে হবে।

তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম যেমন তুলে ধরতে হবে, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও আলোচনায় আনতে হবে।

কারণ সত্যকে বাদ দিয়ে কোনো নেতার জন্য সম্মান তৈরি করা যায় না।

বরং সত্যের সব দিক সামনে রেখেই যদি কোনো নেতার অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়, সেই স্বীকৃতিই সবচেয়ে শক্তিশালী।

আমি তাই নোবেল পাওয়ার দাবিকে শুধু একটি পুরস্কারের দাবি হিসেবে দেখতে চাই না।

আমি এটিকে দেখতে চাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি হিসেবে।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতা সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কেউ রাজপথে ছিলেন, কেউ কারাগারে গেছেন, কেউ জীবন দিয়েছেন, কেউ রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা প্রয়োজন।

আর সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম অবশ্যই আসবে।

নেলসন ম্যান্ডেলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বিশ্ববাসীর সামনে আরও দৃশ্যমান করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে সেই উদ্যোগ শুরু হতে পারে।

তাঁর নামে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে গণতন্ত্রবিষয়ক বক্তৃতামালা চালু হতে পারে।

আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর গণতান্ত্রিক অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা দেওয়া যেতে পারে।

এসব উদ্যোগ নোবেলের বিকল্প নয়; কিন্তু এগুলো ইতিহাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।

আমি বিশ্বাস করি, কোনো রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর পদ নয়, তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।

খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—এটি ইতিহাসের একটি তথ্য।
তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন—এটিও একটি তথ্য।

কিন্তু এর বাইরেও তিনি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিলেন—এটাই তাঁর বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।

১৯৯০-এর গণআন্দোলন, ১৯৯১-এর নির্বাচনী পরিবর্তন এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ‘আপসহীনতা’ শব্দটি যেভাবে যুক্ত হয়েছে, সেটিও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজ তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা তাঁর অনেক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারেন। তাঁর সমর্থকেরা তাঁর সংগ্রাম ও ত্যাগের কথা তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু ইতিহাসের বিচার হবে আরও দীর্ঘ সময়ের পর।
আমার বিশ্বাস, সেই ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম থাকবে।

তাই আজ বিশ্বের সচেতন নাগরিক, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রপন্থী সংগঠন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও রাজনৈতিক ইতিহাসবিদদের সামনে আমি একটি প্রশ্ন রাখতে চাই—

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম করা বেগম খালেদা জিয়া কি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিদার নন?

নোবেল শান্তি পুরস্কার মরণোত্তর দেওয়ার বিধান না থাকলে নোবেলের কাছাকাছি মর্যাদার কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার বা সম্মান কেন নয়?

তাঁর নামে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পুরস্কার কেন নয়?

তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন নয়?

গণতন্ত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেন নয়?

আমি মনে করি, এই প্রশ্নগুলো শুধু বিএনপির সমর্থকদের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের প্রশ্ন।

কারণ রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়, সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পালাবদল হয়। কিন্তু ইতিহাস থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়কে মুছে ফেলা যায় না।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন সেই ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর নেতৃত্ব এবং তাঁর আপসহীনতার প্রতিচ্ছবি বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে থেকে যাবে।

হয়তো নোবেল পুরস্কার আর সম্ভব নয়।

কিন্তু ইতিহাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অসম্ভব নয়।

আর সেই স্বীকৃতি যদি একদিন আসে, সেটি শুধু বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সম্মান হবে না; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যও একটি সম্মান হবে।

শেষ পর্যন্ত মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে যায়।

শুধু আপসহীনতার জন্যই নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে নিজের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে দেওয়ার জন্য বেগম খালেদা জিয়া আজও অমর।

লেখক পরিচিতি: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102