শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
জুলাই জাদুঘর ঘুরে দেখলেন এনসিপি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রে দাবানল নেভাতে গিয়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ১ মজুদদারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তাই ভেবে মজুদ করবেন : আইনমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস: রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা II – মং এ খেন মংমং যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান সাড়ে ৭ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ইনফান্তিনোকে নরওয়ে ফুটবল প্রধানের আল্টিমেটাম দেশে ভারি বৃষ্টির সতর্কবার্তা, ১০ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস ৫৩ নং ওয়ার্ডের সড়কে নেমপ্লেট স্থাপনের উদ্যোগ চান মিয়া ব্যাপারীর ৭ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস: রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা II – মং এ খেন মংমং

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য- “Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-being”- আমাদের সামনে এক গভীর মানবিক ও নীতিগত বাস্তবতা উন্মোচন করে। বাংলায় যার ভাবার্থ; “আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো: জীবন ও সুস্থতা রক্ষা করা” তা কেবল একটি প্রতীকী আহ্বান নয়; বরং এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মর্যাদার প্রশ্নকে বিশ্বপরিসরে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করে।

আদিবাসী ধাত্রীরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসবকালীন সেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তারা শুধু সন্তান জন্মদানে সহায়তাকারী নন; বরং একটি সমন্বিত, সংস্কৃতি সংবেদনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারক। তাদের ভেষজ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সামাজিক সহায়তা এবং মানবিক সংযোগ একটি স্বতন্ত্র চিকিৎসা-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই জ্ঞানকে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে একদিকে যেমন এই মূল্যবান ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে আদিবাসী নারীরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই বাস্তবতার গভীরে রয়েছে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশ্ন। ভূমি আদিবাসীদের জন্য কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের মূলভিত্তি। এক সময় তাদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভূমিনির্ভর; কৃষিকাজ, বনজ সম্পদ আহরণ, গবাদিপশু পালন এবং জলাভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যচাষ ও মাছ আহরণ ছিল তাদের জীবিকার প্রধান স্তম্ভ।

কিন্তু ভূমি দখল, জলাশয় ভরাট, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে উচ্ছেদ, বন উজাড় এবং প্রশাসনিক বৈষম্যের কারণে তারা ক্রমাগত তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড ও জলসম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে কৃষি, পশুপালন এবং মৎস্যভিত্তিক জীবিকায়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, আয় কমছে, এবং দারিদ্র্য আরও তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য এবং জ্ঞানব্যবস্থা।

এই প্রেক্ষাপটে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন আজ সময়ের দাবি। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং একটি ন্যায্য অধিকার; যা তাদের পরিচয়, ইতিহাস এবং অবদানের স্বীকৃতি বহন করে। বর্তমান বাস্তবতায় যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় শক্তিশালী গণরায়ের ভিত্তি রয়েছে, তখন সংবিধান সংস্কার ও পরিমার্জনের একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হলে তা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। “তাদের ছাড়া তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নয়” এই নীতিই হতে পারে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।

উন্নয়নের বর্তমান ধারা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। পরিকল্পনাহীন পর্যটন, ভূমি দখল এবং পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে যে উন্নয়ন বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা আদিবাসী সমাজের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। অথচ অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি এবং ন্যায়ভিত্তিক নীতিমালার মাধ্যমে কৃষি, মৎস্যচাষ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং সংস্কৃতি ভিত্তিক পর্যটনের সমন্বয়ে টেকসই জীবিকায়ন গড়ে তোলা সম্ভব।

স্বাস্থ্যখাতে আদিবাসী ধাত্রীদের প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সংস্কৃতিসংবেদনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় হতে হবে। মাতৃভাষা ভিত্তিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ ছাড়া আদিবাসী সমাজের স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। উন্নয়ন যদি মানুষের পরিচয় মুছে দেয়, তবে তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক ক্ষয়।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন কোনো একক খাতের বিষয় নয়; এটি ভূমি, জীবিকা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সমন্বিত বাস্তবতা। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত, মানবিক এবং দূরদর্শী। ভূমি ও জলসম্পদের অধিকার নিশ্চিত না করে, মৎস্যচাষ ও কৃষিভিত্তিক জীবিকাকে টেকসই না করে, কিংবা আদিবাসী ধাত্রীদের জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়; এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে উপলব্ধি করতে হবে; অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না। নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা শুধু গণতান্ত্রিক দায় নয়; এটি উন্নয়নের মৌলিক পূর্বশর্ত। তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রান্তে রেখে গৃহীত যে কোনো সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য ও অস্থিরতাকে আরও বাড়াবে।

এই প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক স্বীকৃতি হতে পারে একটি কেন্দ্রীয় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ; যা আদিবাসীদের পরিচয়, অধিকার ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণের ভিত্তি গড়ে দেবে। এটি কেবল আইনি পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি নৈতিক অঙ্গীকার।

অতএব, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আমাদের যে বার্তা দেয় তা স্পষ্ট; উন্নয়ন হতে হবে মানুষের জন্য, মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে সম্মান জানিয়ে, তাদের সক্রিয় অংশীদারিত্বে এগিয়ে গেলে তবেই গড়ে উঠবে একটি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা।

লেখক: ক‌বি, আ‌দিবাসী কল‌্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার সভাপ‌তি এবং কক্সবাজার সাংস্কৃ‌তিক কে‌ন্দ্রের সা‌বেক প‌রিচালক।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102