রাজধানীর নিকুঞ্জ-২-এর টানপাড়া পশ্চিমপাড়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি হাজারো মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। গত প্রায় দুই বছর ধরে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)-এর আওতাধীন ZT100 নম্বরের একটি ট্রান্সফরমারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত লোড পড়ছে। ফলে দিনের যেকোনো সময়, এমনকি গভীর রাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ জানালে সাময়িকভাবে সংযোগ সচল করা হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল মাঝেমধ্যে ঘটে যাওয়া সমস্যা। কিন্তু এখন তা প্রায় প্রতিদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। প্রতিবার ডেসকোর হটলাইনে অভিযোগ জানিয়ে কারিগরি কর্মীদের এনে সমস্যা সাময়িকভাবে সমাধান করা হলেও কয়েক ঘণ্টা কিংবা এক দিনের মধ্যেই আবার একই অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, গত কয়েক বছরে টানপাড়া পশ্চিমপাড়ায় দ্রুত নগরায়ণ হয়েছে। একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ওভেনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই ZT100 ট্রান্সফরমারটি তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি লোড বহন করছে। সামান্য চাপ বাড়লেই সেটি ট্রিপ করে অথবা বিকল হয়ে পড়ে, যার পুরো ভোগান্তি বহন করতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।
স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হ্যাভেন বলেন, “দুই বছর ধরে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছি। দিনে হোক বা রাতে, কখন বিদ্যুৎ চলে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে গরমে রাত কাটানো খুবই কষ্টকর। আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করি। তাহলে কেন এই মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হব? প্রতিবার অভিযোগ দিলে সাময়িকভাবে লাইন ঠিক করা হয়, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার একই অবস্থা।”
একই এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমান স্বপন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকা এখন যেন আমাদের এলাকার নিয়মিত ঘটনা। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হচ্ছে, গরমে বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বারবার অভিযোগ করেও স্থায়ী সমাধান পাচ্ছি না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না; শুধু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই।”
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। ছোট দোকান, দর্জির কারখানা, সেলুন, ফটোকপির দোকানসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো যায় না, ফলে অনেক সময় পুরো এলাকায় পানির সংকটও দেখা দেয়।
বর্তমানে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলমান থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পরীক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার। রাতের পড়াশোনার মাঝখানে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী চার্জার লাইট, মোমবাতি কিংবা মোবাইল ফোনের আলোয় পড়তে বাধ্য হচ্ছে। অনেক পরিবারের পক্ষে বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা রাখা সম্ভব নয়।
এদিকে চলমান ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর সময়ও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে খেলা উপভোগের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী। তাঁদের ভাষায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন শুধু দৈনন্দিন জীবনকেই নয়, মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ-বিনোদনও ব্যাহত করছে।
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল বলেন, “রাজধানীর একটি এলাকায় একই সমস্যার সমাধান দুই বছরেও না হওয়া উদ্বেগজনক। ডেসকো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎসেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি এলাকার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে—এটি তো ডেসকোর অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে সময়মতো ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা কেন বাড়ানো হলো না?”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান ZT100 ট্রান্সফরমারটি এলাকার বিদ্যমান লোড বহন করতে পারছে না। তাই বারবার সাময়িক মেরামত করে সমস্যার সমাধান হবে না। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনই হবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। আমরা আশা করি, ডেসকো দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাক্কের হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হবে। যদি ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। এলাকাবাসীর ভোগান্তি কমাতে যা যা করণীয়, তা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হবে।”
বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে বর্তমান ZT100 ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন, প্রয়োজনে ফিডার লাইন আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত লোড অডিটের কোনো বিকল্প নেই।
টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সাময়িক জোড়াতালির পরিবর্তে এবার কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করবে ডেসকো। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা অতিরিক্ত কোনো সুবিধা চান না; নিয়মিত বিল পরিশোধকারী গ্রাহক হিসেবে চান শুধু নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বিদ্যুৎসেবা। রাজধানীর একটি এলাকায় বছরের পর বছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এখন তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা—বারবার মেরামত নয়, এমন একটি স্থায়ী সমাধান, যা হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ–দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।