মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রান্তিকতম মানুষের কাছেও পৌঁছায় শুধু গোলে নয়, র‌্যাংকিংয়েও শীর্ষে মেসি প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাজায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে না যুক্তরাষ্ট্র সাভার ও আমিনবাজার উপজেলা ভূমি অফিস পরিদর্শন করলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ব্রাজিলের এই বিশ্বরেকর্ড আগামী চার বছরেও কেউ ভাঙতে পারবে না মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড সাভারে হেরোইনসহ ২ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির ৪র্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত

রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রান্তিকতম মানুষের কাছেও পৌঁছায়

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

প্রান্তিকের পক্ষে রাষ্ট্র: আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীর করমুক্তির প্রয়োজনীয়তা 
– মং এ খেন মংমং

 

রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রান্তিকতম মানুষের কাছেও পৌঁছায়। এই বাস্তবতা সামনে রেখেই বর্তমান সরকারের আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীদের কৃষি-ব্যবসা ও বেতন আয়করমুক্ত করার প্রস্তাবটি একটি সময়োপযোগী, মানবিক ও দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ। তাই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো এবং সরকারকে ধন্যবাদ দেওয়া ন্যায্য ও প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীরা দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতা এবং সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের কারণে মূলধারার উন্নয়ন থেকে অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। পাহাড়ি ও সমত‌লের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনগোষ্ঠীর জীবিকা প্রধানত কৃষিনির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা স্বনির্ভরতার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। ফলে তাদের আয় অনিশ্চিত, সঞ্চয়ের সুযোগ কম এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রও সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে করমুক্তির সুবিধা তাদের অর্থনৈতিক স্বস্তি দেবে, আয়ের ওপর চাপ কমাবে এবং জীবনমান উন্নয়নের পথকে সহজ করবে।

এই উদ্যোগের অন্যতম বড় শক্তি হলো- এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নয়নের সুফল সবার মাঝে সমভাবে বণ্টন করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীদের জন্য করমুক্তির ব্যবস্থা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং এটি একটি ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, যা তাদের সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেয়। এই ধরনের ইতিবাচক বৈষম্যই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করে।

অন্যদিকে, করমুক্তির এই সুবিধা আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিপণ্য, বনজ সম্পদ, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে তারা নতুন করে উৎসাহিত হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে অর্থনৈতিক গতিশীলতা সৃষ্টি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শহরমুখী জনস্রোত কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও গভীর। আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তারা তাদের নিজস্ব পরিচয় আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে পারবে। এতে করে সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে- যা একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।

তবে যেকোনো নীতিগত উদ্যোগের মতোই এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা উপেক্ষা করা যাবে না। প্রথমত, প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সঠিক ও নির্ভুল ডাটাবেজ না থাকে, তাহলে ভুয়া পরিচয়ে কেউ এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারে, যা নীতির উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। এ ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও নিয়মিত হালনাগাদকৃত ডাটাবেজ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা ও তথ্যের ঘাটতিও একটি বড় বাধা হতে পারে। অনেক আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠী এখনো আধুনিক করব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে তারা এই সুবিধা সম্পর্কে জানতেই নাও পারে, বা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হতে পারে। এজন্য স্থানীয় ভাষায় সচেতনতা কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ এবং সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, বাজারসংযোগের অভাব একটি বাস্তব সমস্যা। করমুক্তি থাকলেও যদি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তাই যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও বিপণন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া কিছু অতিরিক্ত ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। যেমন- নীতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে স্থানীয়ভাবে বৈষম্য বা অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদে করমুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হলে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে কিছুটা সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। তাই সময়োপযোগী পর্যালোচনা ও নীতির ধাপে ধাপে সমন্বয় করা প্রয়োজন।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন- প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজ ও যাচাইকরণ ব্যবস্থা চালু করা, স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি নেতৃত্বের সমন্বয়ে তদারকি জোরদার করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান, এবং পণ্যের বাজারসংযোগ ও মূল্য নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। পাশাপাশি নীতির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে।
সর্বোপরি বলা যায়, আ‌দিবাসী নৃগোষ্ঠীদের কৃষি-ব্যবসা ও বেতন আয়করমুক্ত করার প্রস্তাবটি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় সংহতির প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ ও টেকসই করে তুলতে সক্ষম হবে।
লেখক প‌রি‌চি‌তি : ক‌বি মং এ খেন মংমং হ‌লেন- আ‌দিবাসী কল‌্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার সভাপ‌তি ও কক্সবাজার সাংস্কৃ‌তিক কে‌ন্দ্রের সা‌বেক প‌রিচালক।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102